তিস্তার চরে, ভোটের মাঠে
মরে যাওয়া তিস্তার বালুচর ঢেকে গিয়েছে তামাকের সবুজ পাতায়। যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিষাক্ত তামাকের ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য। মুগ্ধ না হয়ে থাকার উপায় নেই।চরের সবগ্রামই তামাকে আচ্ছাদিত। পানিশূন্য তিস্তার বুক চিরে জেগে ওঠা চরগুলোয় ভাঙাগড়ার সংসারে ফসল তোলায় ব্যস্ত ছিল কৃষকরা। আবহমান নদী বিধৌত গ্রামীণ কৃষক সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান ব্যস্ত তামাকপাতা উঠানো ও রোদে শুকানোর কাজে।
উন্নয়ন বঞ্চিত এই অঞ্চলের মেঠোপথের দু’ধার জুড়েই চোখে পড়ছিল লম্বা রশিতে রোদে শুকাতে দেওয়া তামাকের পাতা। দেখতে মনে হচ্ছিল মলিন ধূতিকাপড়ের সামিয়ানা। বিবর্ণ পাতায় লেখা সংসারের চাকা সচলের গল্প। তাদের জীবনের গল্পের কাছে উন্নয়ন ও সংস্কারের গল্প অচ্ছুৎ কিংবা অধরা স্বপ্নের মতোই। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তাদের বারবার আশাহত করে তুলেছে। একদিকে হঠাৎ বন্যা, অন্যদিকে অতিরিক্ত খড়া এবং নদী ভাঙনের যন্ত্রণা বুকে চেপে দিনপার করা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট’ নতুন কোনো চমক নিয়ে আসেনি। আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপি ও জামায়াতের তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ‘কথার কথা’ হিসেবেই আখ্যায়িত। দীর্ঘদিনের প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় স্মৃতি পূর্ণ মগজে বেঁধেছে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। চোখের ভাষায় বুঝে নিতে হচ্ছিল, কেউ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন আনবে–এমনটা বোধহয় আশা না করাই ভালো।
খেতে-খামারে খেটে খাওয়া যুবক ও প্রৌঢ়ের দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যাওয়া ধুলোবালিময় পথ পাড়ি দিয়ে আমরা যখন রংপুরের তিস্তা অববাহিকার গংগাচরা উপজেলার চরের গ্রামগুলো পার হচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল নির্বাচনি আমেজহীন ফসলিজগতে বিচরণ করছি। বসন্ত আসি আসি, স্নিগ্ধ রোদটাও কড়া লাগছিল রোদে ঝলসে যাওয়া গ্রামীণ শিশুদের খসখসে ত্বকের মতো। বেঁচে থাকার দৈনন্দিনকার সংগ্রামে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি, তা খুব করেই অনুধাবন করছিলাম।
একদিকে সংসারের বিস্তর ব্যয় আর অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যুগের ডিশ টিভি ও ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানির পাতানো জৈবিকতার কিছুটা ছাপ তাদের ওপর প্রভাব ফেললেও, স্বল্প আয়ের সুবিধা বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর কাছে সংস্কারের অঙ্গীকারটুকু ঠিকঠাক পৌঁছায়নি কিংবা তা আমরা টের পাচ্ছিলাম না। গড্ডালিকায় প্রভাবিত রাজনৈতিক চেতনা অথবা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবিশ্বাস বা তথাকথিত রাজনীতিকদের ভাঁওতাবাজি কিংবা কথার ফুলঝুরি মেলায় ফুলানো রঙিন বেলুনের মতো এবার আর আকর্ষণ ধরায়নি। হাফ ছেড়ে বাঁচার তাগিদে ‘যায়ে আসুক, মুই ভালো থাকপার চাঁও’ বুলিতে দীর্ঘ দাড়ি বসিয়ে দিয়েছে তারা। আশাহীনের মতো নিথর আগ্রহ অধিকাংশকেই ভোটমুখী করতে পারেনি, বললে অসত্য দাবি করা হবে না।
গ্রামের পর গ্রাম ও গ্রামীণ ছোট ছোট বাজার পেরুতে পেরুতে নির্বাচনি প্রচারণার বদলে যাওয়া চিত্র খুঁজছিলাম আমরা। প্রচার প্রচারণার ধরন পরিবর্তনে প্রার্থীদের পোস্টার চোখে পড়েনি সেভাবে। কাপড়ের ব্যানারের ছড়াছড়িও ছিল না কোথাও। এর মধ্য দিয়েই যতটুকু নির্বাচনি হাওয়া তাদের গায়ে লেগেছে, তার সিংহভাগটাই ধর্মীয় রাজনীতির বয়ান। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদের মত ‘বেহশত পাওয়া’ যায় প্রচারণায় কেউ কেউ ধর্মীয় রাষ্ট্রচিন্তায় ডুবেছে, তামাকের গন্ধের সঙ্গে সেই আভাসটুকু পাওয়া যাচ্ছিল তরুণদের শোরগোলে, নারীদের চলনে ও ভোটের লাইনে।
ভোটের পর্যবেক্ষক হিসেবে গন্তব্যে পৌঁছবার পর থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল সমানে সমান। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা ঘুরছিলাম নদী ভাঙনের শিকার তিস্তাপাড়ের ভোট কেন্দ্রগুলোতে। সব কেন্দ্রই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায়। সিংহভাগই অনুন্নত অবকাঠামো ও ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সিসি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত থাকায় স্বস্তি পাচ্ছিলাম কিছুটা। কয়েকটি কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের বডি ওন ক্যামেরাও আলাদা দৃষ্টি কেড়েছে আমাদের। শুধু দৃষ্টির অগোচরে ছিল কাঙ্ক্ষিত ভোটারের উপস্থিতি।
তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় কিছুটা নেটওয়ার্কে অগ্রসর দুর্গম এসব জনপদেও নির্বিঘ্নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন সংবাদপত্রগুলোয় বারবার চোখ বুলাতে পাচ্ছিলাম। নিউজ ফিডে ভেসে আসা দেশের নানা প্রান্তের নির্বাচনি সহিংসতা আমাদের উদ্বেগকেও বাড়িয়ে তুলছিল। নবাগত আগন্তুক ‘পর্যবেক্ষকে’ই পর্যবেক্ষণ করছিল ‘ভিলেজ পলিটিক্স’র চতুর চোখগুলো। সন্দেহ ও অতি উৎসাহ আমাদের ঘাবড়ে তুলছিল বারবার। এর মাঝে ভোটকেন্দ্রে নিযুক্ত নির্বাচন কর্মকর্তাদের অনাগ্রহ কিংবা অবহেলা আমাদের খানিকটা অসহায়ও করে তুলেছে কোথাও কোথাও। বিভ্রান্তিকর তথ্য, তথ্য প্রদানে অসহযোগিতমূলক আচরণ উপেক্ষা করেই আমরা ভোটের আমেজ খুঁজে ফিরছিলাম। খুঁজছিলাম হারিয়ে যাওয়া ভোটের উৎসব। খুঁজে পাওয়া দুরূহই বটে। দিনশেষে মনে হলো, অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমাদের থেকে দূরে সরে রইল। বরাবরের মতোই ভোটের মাঠে তবুও সংঘাত, সংঘর্ষ পিছু ছাড়েনি, শুধু পিছু হটেছে ভোটারের দীর্ঘসারি।