উপসাগরীয় অস্থিরতা ও খাদ্যনিরাপত্তার অশনিসংকেত
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু এই উত্তেজনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি কেবল যুদ্ধ বা ভূরাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য এক গভীর আঘাতের আশঙ্কা। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মাঝখানে অবস্থিত সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রনালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত। প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার প্রশস্ত এই পথটি মূলত পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান সংযোগ সেতু। যদি এই নৌপথে দীর্ঘ সময়ের জন্য জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় বা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর প্রভাব শুধু তেল ও গ্যাসের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এর প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাবে বিশ্ব কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার গভীর স্তরে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই পথেই চলাচল করে। কিন্তু এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সারের কাঁচামাল ও প্রস্তুত সারের বিশাল প্রবাহও একই পথের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণ বলছে, বৈশ্বিক সারের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া ইউরিয়া সারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ এবং সালফারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই তথ্যটি বোঝার জন্য আধুনিক কৃষির প্রকৃত কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। কৃষি কেবল মাটি, বৃষ্টি ও সূর্যালোকের ওপর নির্ভর করে না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রিটজ হাবার ও কার্ল বোশ নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করার মাধ্যমে শিল্পভিত্তিক অ্যামোনিয়া উৎপাদনের পথ খুলে দেন। এই প্রযুক্তি থেকেই তৈরি হয় ইউরিয়া ও অন্যান্য নাইট্রোজেন সার, যা আধুনিক কৃষির অন্যতম ভিত্তি। আজ বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর নির্ভরশীল।
এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো পারস্য উপসাগর অঞ্চল। এখানে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎসগুলোর একটি রয়েছে, যা অ্যামোনিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। ফলে গত কয়েক দশকে কাতার, সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান বিশাল সার শিল্প গড়ে তুলেছে। এই অঞ্চল থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি টন ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয় এবং এসব রপ্তানির অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। এই সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়।
প্রথমে বাড়তে শুরু করে পরিবহন ব্যয় ও বিমা খরচ। তারপর বাজারে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। জাহাজ চলাচলে বিলম্ব হলে সার সরবরাহের সময়সূচি ভেঙে যায়। কৃষকেরা বপন মৌসুমের আগে প্রয়োজনীয় সার হাতে না পেলে তারা বাধ্য হন বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে। কেউ বেশি দাম দিয়ে সার কিনে নেন, কেউ সারের ব্যবহার কমিয়ে দেন, আবার কেউ ফসলের ধরন বদলে ফেলেন। কিন্তু কৃষিবিজ্ঞানের বাস্তবতা হলো নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফসলের ফলন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কমে যেতে পারে। এর ফলে কয়েক মৌসুমের মধ্যেই বিশ্ব খাদ্য উৎপাদনে লক্ষ লক্ষ টন ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।
এই সংকটের আরেকটি দিক হলো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার গভীর আন্তঃনির্ভরতা। অনেক দেশ নিজেদের সার উৎপাদন করলেও তার কাঁচামাল বা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণ হিসেবে ভারতকে ধরা যায়। দেশটি বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া উৎপাদন করলেও তার কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আবার ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বড় কৃষি উৎপাদক হলেও নাইট্রোজেন ও ফসফেট সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ সার উৎপাদক দেশও আঞ্চলিক চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া আমদানি করে। ফলে এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।