মারিবার হলো তার সাধ
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার পর আজকের সামরিক দশা গোটা বিশ্বের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। একে ‘মারিবার হলো তার সাধে’র সঙ্গে তুলনা করা হলো কিংবা এটাও বলা যেতে পারে যে, মানুষ ‘মারিবার সাধ’ জেগে উঠেছে ট্রাম্পের মনে। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র তার শিখ-ি ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুদ্ধের সূচনা করত না। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াচডগ বাংলায় যাকে ‘রক্ষিতাকুকুর’ বলা যেতে পারে, সেই ইসরায়েলের উসকানিতে আজ তিনি যে নরক সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, তাকে ভয়াবহ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। আরব আমিরাতের এক ধনকুবের প্রশ্ন করেছেন, ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে ‘আপনার কী অধিকার আছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধাবার? এ প্রশ্নটি কেবল সেই ধনকুবেরের নয়, হয়তো আমিরাতের সব নাগরিকের এবং সারা মধ্যপ্রাচ্যের, সব দেশের নাগরিকের এই প্রশ্ন কী অধিকার আছে তার?
না, তার কোনো অধিকার নেই। তারপরও এই মানবতাবিরোধী যজ্ঞ কেন? আর সেই অধিকার কি কেউ তাকে দিয়েছে? বা কোন বাহুবলে তিনি ইরানের মতো একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী দেশের ওপর সামরিক হামলা চাপিয়ে দিয়েছেন? যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী মিত্রও এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছে। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষায়, এটি মূলত একজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। তার মানে, ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার ওপর যে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন ট্রাম্প, সেই পদ্ধতির পুনর্ব্যবহার করলেই ইরান মাথানত করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেল লুটের পথ খোলাসা করে দেবে এমন সহজ ও বোকা চিন্তার পেছনে রয়েছে অন্য কেনো আইডিয়া ও যুক্তির তথ্য।
তেলই কেবল সমস্যা তা নয়, ইরান যে মুসলিম বিশে^র এক শক্তিশালী দেশ, পারসিয়ান সভ্যতার শেকড়, তা ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন। কিন্তু এ দেশটি যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া নয়, এটা তিনি জানেন না। পরমাণু বোমার অধিকারী হতে দেবে না ইরানকে, তাকে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র নিয়েই থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অধীনেই থাকতে হবে, এটাই প্রমাণ করতে ট্রাম্প তার প্রহরী কুকুরের পরামর্শ নিয়েছে। ইসরায়েল কেন ট্রাম্পকে ভজাতে পারল? কারণ কি ইসরায়েলের অস্তিত্ব বিলোপ করার ক্ষমতা ইরানের আছে বা তৈরি হচ্ছে, এই ভয়ে? মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী। প্রতিশ্রুত বিনিয়োগকারী। ওই বিনিয়োগের বলেই যে বিশ্ব অর্থনীতির মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র এতটা দাম্ভিক হয়ে উঠেছে, তা বলা বাহুল্য। আবার এটাও আমাদের মনে আছে যে, ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনের প্রবক্তা স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের দেওয়া ব্যাখ্যার আধারে পশ্চিমা বিশ্বের মুসলমানদের হত্যা করা বা তাদের রাষ্ট্রকে দুর্বল করে নিজেদের শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। ‘সভ্যতার সংঘর্ষ এবং বিশ্বব্যবস্থার পুনর্নির্মাণ’কে চীন এবং বিশে^র ইসলামী ও অর্থোডক্স সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমেরিকান-সৃষ্ট পশ্চিমা আগ্রাসনের তাত্ত্বিক বৈধতা বলে অভিহিত করেছেন। অন্যান্য সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, হান্টিংটনের শ্রেণিবিন্যাস সরল এবং স্বেচ্ছাচারী এবং সভ্যতার অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা এবং দলীয় উত্তেজনা বিবেচনা করে না। অধিকন্তু সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, হান্টিংটন অভিজাতদের দ্বারা আদর্শিক সংহতি এবং জনসংখ্যার অপূর্ণ আর্থ-সামাজিক চাহিদাগুলোকে দ্বন্দ্বের প্রকৃত কারণ হিসেবে উপেক্ষা করেন। তিনি এমন দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করেন, যা তার দ্বারা চিহ্নিত সভ্যতাগত সীমানার সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খায় না এবং তার নতুন দৃষ্টান্ত বাস্তববাদী চিন্তাভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয় যেখানে ‘রাষ্ট্রগুলো’ ‘সভ্যতা’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। মার্কিন নীতির ওপর হান্টিংটনের প্রভাবকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এশিয়ান নেতাদের সম্পর্কে ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবির বিতর্কিত ধর্মীয় তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। হান্টিংটনের ওপর নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক শোকবার্তায় বলা হয়েছে যে, ‘[বিশ্বব্যাপী সংঘাতের উৎস হিসেবে] রাষ্ট্র বা জাতিগত গোষ্ঠীর বিপরীতে প্রাচীন ধর্মীয় সাম্রাজ্যের ওপর তার জোর... ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।’
২.
যুদ্ধ কত দিন চলবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় অজানা প্রশ্ন, যা এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ধারণ করবে। প্রতিদিন যুদ্ধের খরচ বেড়েই চলেছে। ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান চার বা পাঁচ সপ্তাহ বা ‘যতদিন প্রয়োজন’ ততদিন চলতে পারে। তবে এরপর কী হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দেননি। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস বলেন, ইরানে মার্কিন সামরিক কৌশল প্রশংসনীয়। তবে রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়, বিষয়টি পুরোপুরি ভেবে দেখা হয়নি। হ্যাঁ, ভূরাজনীতিতে সাংস্কৃতিক বিষয়টি কি উহ্য থাকে? বলা মুসকিল। ভূরাজনীতির কলাকৌশল যদি মনে রাখি, তাহলে আমরা বলতে পারি ট্রাম্পের ‘যতদিন প্রয়োজন’ ততদিন যুদ্ধ করার সাহসও ক্ষমতা তার আছে কি না তা বিবেচনা করে দেখতে হবে। এটা নিশ্চিত যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিজয় অর্জনের জন্য ট্রাম্প আবারও দেখাতে চান যে, তিনি দেশকে ‘মেইক গ্রেট এগেইন’ করে দেশবাসীকে তাক লাগাতে চান। আর তার এই প্রকল্পের প্রণোদনা দিয়েছে অস্ত্র উৎপাদক ধনবান শ্রেণি। এরা রিপাবলিকানদের দলে, সিংহভাগ। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গেও তাদের ভাব-ভালোবাসা আছে বটে, তবে তা সীমিত পর্যায়ে। অস্ত্র উৎপাদকদের চাপে তিনি একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এতে করে অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষ মারার কাজে। এপস্টেইনের অনুগত ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন বিকৃতপ্রবণ মানুষ। তার পক্ষে হেন কোনো সিদ্ধান্ত নেই, যা গ্রহণ করা কঠিন। পৃথিবীতে মানুষ বেশি হয়ে গেছে, অতএব যত পারো হত্যা করো। বিশেষ করে এশিয়ায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। আর সেই জনসংখ্যা যদি জনশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে সেই স্রোত ঠেকাবার কোনো মারণাস্ত্র নেই। চীনের ওপর তার রাজনৈতিক ও সামরিক টার্গেট আছে। চীন এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক। নিজেদের উন্নতিতেই মগ্ন দেশটি। পাশাপাশি তার প্রকল্পগুলো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের সঙ্গে, যাদের উন্নত করা গেলে আঞ্চলিক সামরিক ও বেসামরিক খাতের ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভূরাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বন্ধ করে, যদি আঞ্চলিক স্বার্থ, মুসলমানের স্বার্থ দেখাতে চায়, তাহলে শিখ-ি ইসরায়েলের অস্তিস্ত বিলীন হতে পারে। মূলত ওই প্রহরী রাষ্ট্রটিকে বসানো হয়েছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার কাজটি করতে পারে। ইসরায়েল সেটাই করছে। সে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মার্কিনি বন্ধুত্ব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মৈত্রী নির্মাণ করতে পারত, তাহলে সংঘাত হতো না। মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে মেনে নিতে দ্বিধা করত না। এটা মনে রাখতে হবে যে, ইসরায়েল কোনো দেশ নয় ওয়াচডগ, নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে বসানো হয়েছে। সে আসলে গোটা ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতিনিধি। ইরান কেবল শত্রু হিসেবে ইসরায়েলকে আক্রমণ করেনি, সে আমেরিকার অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে মনে করে। আবার আমিরাত, সৌদি আরব (আসল নাম জাজিরাতুল আরব), সৌদ পরিবার ব্রিটিশদের সহযোগী হয়ে তুর্কি সালতানাত বা উসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতনে বিশেষ ভূমিকার পুরস্কারস্বরূপ ওই দেশটিকে নিজেদের পরিবারের সম্পত্তি করে নিয়েছে। দেশের নাম তাই পাল্টে নিয়েছে।