ফ্যামিলি কার্ড : সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অভিযাত্রা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের বয়স এখনো এক মাস পূর্ণ হয়নি। তবে এরই মধ্যে এই সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে দেশবাসীর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে একটির পর একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
ঈদের আগেই দেশের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি ভাতা প্রদানের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। কৃষক কার্ড, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্পর্কেও সরকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দেশের ১৩টি জেলা, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীর মধ্যে বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের পরীক্ষামূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে তালিকায় থাকা নারীদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসে দুই হাজার ৫০০ টাকা জমা হয়ে যায়। এখন থেকে প্রতি মাসেই তাঁরা এই টাকা পাবেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আয়বৈষম্য এবং নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এখন রাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়াকে কেবল নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সুরক্ষা নীতির সূচনা হিসেবে দেখা বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষার ধারণা ও কর্মসূচি একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি ইত্যাদি চালু করেছে। বর্তমানে দেশে শতাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ সহায়তা পেয়ে থাকে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় মোট বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। তবু বাস্তবতা হলো—এই কর্মসূচিগুলোর অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধাভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড ধারণা ও এর সূচনা গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি পরিবারভিত্তিক ডেটা বেইস, যা পরিচয়পত্রের মতো কাজ করবে। এই কার্ডের প্রধান লক্ষ্য নারীর ক্ষমতায়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে সরকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে হতদরিদ্র, ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়তা দেবে। কার্ডধারীরা সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা, সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা বা কৃষি ভর্তুকি পেতে পারেন। নগদ অর্থ সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও সেবা প্রদান করবে অর্থাৎ এর মাধ্যমে সরকার একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করবে।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও দারিদ্র্য হ্রাসকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ইশতেহারে বিশেষভাবে বলা হয়, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হবে। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রাথমিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সাশ্রয়ী বা ন্যায্যমূল্যে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা গেলে বাজারের অস্থির মূল্য পরিস্থিতির মধ্যেও ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।