৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করল কে?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ফেইসবুকে শেয়ার করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেল। এই ‘অপরাধে’ তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতাকর্মী। ক্যাম্পাসে দফায় দফায় তার ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। এমনকি শাহবাগ থানার ভেতরেও পুলিশের সামনে চলে মারধর। অবশেষে অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যায়।
পাভেল এখন হাসপাতালে ভর্তি। তার মা গিয়েছিলেন থানায় মামলা করতে। দীর্ঘ সময় বসেছিলেন। পুলিশ টালবাহানা করছিল—এমন অভিযোগও উঠেছে। এ অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হন অভিযুক্তরাই। সেখানে থাকা একজন সাংবাদিকের ভাষ্য: অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই থানা নিয়ন্ত্রণ করেন! অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টা না যেতেই পাভেলের মা পারভীন আক্তার অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। শাহবাগ থানায় জমা দেওয়া অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে আরও ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিল। তারা সবাই জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজনীতিতে যুক্ত।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে যেসব উগ্রবাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দেশব্যাপী মবসন্ত্রাস চালাচ্ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারের যাত্রা শুরুর পরে তারা আইনের আওতায় আসবে বা তাদের সেই কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে—জনমনে এই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কোনো পরিস্থিতির পরিবর্তন হলো কি না, এখন সেই প্রশ্ন উঠছে।
পাভেলের এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের কথা। তিনি ভারতবিরোধী পোস্ট দিয়েছিলেন ফেইসবুকে। তার জেরে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এবার একইভাবে ফেইসবুকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করায় পাভেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাল দুটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ফেইসবুকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শেয়ার করায় নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেল।
এ যাত্রায় পাভেল বেঁচে গেছেন। তখন নিপীড়কের ভূমিকায় ছিল ছাত্রলীগ। এখন ছাত্রশক্তি। অর্থাৎ সময় বদলেছে। রাজনৈতিক পরিচয় বদলেছে। কিন্তু নিপীড়নের ধরন বদলায়নি। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে একটি সুস্থ স্বাভাবিক আর সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা ছিল—তা বোধ হয় এখনও ‘দিল্লি দূর অস্ত’।
প্রশ্ন হলো, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে, স্বাধীনতার স্থপতির ভাষণ ফেইসবুকে শেয়ার করার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হবে এবং তার কোনো বিচার হবে না, বরং অপরাধীরা পুলিশের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরবে আরে নির্যাতিত ব্যক্তির মা অভিযোগ দায়েরের পর প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবেন—দেশটা এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়াল কেন? কাদের ব্যর্থতায় আইনের শাসন এভাবে মার খাচ্ছে খোদ থানার ভেতরেই?
অতীতে এমন ঘটনা ঘটেনি? ঘটেছে। এর চেয়েও ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসব দিয়ে আজকের ঘটনাকে আড়াল করা বা অতীতের অপরাধ দিয়ে বর্তমানের অপরাধকে জায়েজ করার সুযোগ নেই। অতীতে অন্যায় অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলেই একটি বিরাট অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু তারপর কী? এখনও সেই একই তরিকায় দেশ চলবে? ছাত্রলীগ যা করেছে এখন ছাত্রশক্তি আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই একই কাজ করবে?
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, যে মানুষটির ডাকে সাত কোটি মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার ভাষণ ফেইসবুকে শেয়ার করা অপরাধ হয়ে যাবে? এই ভাষণ কি সরকার নিষিদ্ধ করেছে যে এটা শেয়ার করা যাবে না?
পাভেলকে যেদিন এভাবে নির্মম নির্যাতন করা হয় তার দুদিন আগেই গত ৭ মার্চ বিকেলে রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর সময় দুজনকে আটক করা হয়। তাদের একজন ছিলেন আসিফ আহমেদ সৈকত এবং অন্যজন মাইক অপারেটর। এই দুজনকে আটকের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রসংসদের সাবেক ভিপি ও সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে বাম সংগঠনগুলোর ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ কয়েকজন রিকশায় মাইক বসিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি দেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে কয়েকজন এসে তাদের মাইক ও ব্যাটারি ভেঙে ফেলে। এ সময় ইমির সঙ্গে থাকা আবদুল্লাহ আল মামুনকে ছাত্রলীগের তকমা দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে থানার ফটকে নিয়ে মারধর করা হয়। ইমিকেও মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা ইমি ও মামুনকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তারা এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে আছেন।
চানখাঁরপুল মোড় থেকে দুজনকে আটকের বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, ‘ওরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছিল। এটা তো নিষিদ্ধ, এ জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।’ (প্রথম আলো, ৭ মার্চ ২০২৬)।
প্রশ্ন হলো, ওসিকে কে বলল যে ৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ। কে এটা নিষিদ্ধ করল, কবে? ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা কিংবা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সঙ্গে ৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধের কী সম্পর্ক? এটুকু সাধারণ জ্ঞান যার নেই সে লোক একটি গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি হলেন কী করে?
- ট্যাগ:
- মতামত
- নিষিদ্ধ
- ৭ মার্চের ভাষণ