জিরো-সাম গেম: মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন আধিপত্যের সূর্যাস্ত শুরু?
তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় মতাদর্শগত প্রতিযোগিতা, পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের তাগিদ, আঞ্চলিক শক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গভীরভাবে প্রোথিত জাতিগত জটিলতা—এই পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত উপাদান মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত, অস্থির এবং ক্রমপরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্য বহু দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত চলমান সামরিক অভিযান এই উত্তাপকে আরও তীব্র ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে সংঘটিত এই আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু, সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার মতো নাটকীয় ঘটনা সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র এক বিরল মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে। দ্রুত নতুন নেতৃত্বের অভিষেক, সামরিক প্রতিক্রিয়ার নিরবচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের তাৎক্ষণিক সক্রিয়করণ—সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; গভীরভাবে প্রোথিত একটি সিস্টেম-নির্ভর শাসনব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের সিস্টেম-নির্ভর রাজনৈতিক কাঠামো
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ১৯৭৯ সালের শিয়া ইসলামি বিপ্লবের পর এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, যার ভিত্তি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এখানে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতীক হলেও ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি বিস্তৃত, বহুস্তরীয় এবং বিপ্লব-উত্তর নিরাপত্তা ও আদর্শিক অগ্রাধিকারের ওপর নির্মিত। বিপ্লবী গার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা সংস্থা, বাসিজ মিলিশিয়া, নির্বাচিত সরকার এবং অর্থনৈতিক ফাউন্ডেশন—এই বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ে ইরানে এমন এক জটিল ক্ষমতা-জাল গড়ে উঠেছে, যা ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে কাঠামোগত স্থায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকেই অগ্রাধিকার দেয়। এই কাঠামোকে গবেষকেরা প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা (systemic resilience) বলে অভিহিত করেন, কারণ এটি নেতৃত্ব পরিবর্তন বা বাহ্যিক আঘাতের মধ্যেও কার্যকর থাকে।
এই কাঠামোর বিপরীতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যক্তিনির্ভর; ফলে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আংশিক সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইরানে খামেনির মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো সমঝোতার পথে যায়নি; বরং আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। কারণ ইরানের রাজনৈতিক আদর্শ, নিরাপত্তা কাঠামো এবং বিপ্লবী পরিচয় রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি, যা ব্যক্তির মৃত্যুতে পরিবর্তিত হয় না।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিও এই সিস্টেম-নির্ভর কাঠামোর অংশ। ২০১৫ সালের JCPOA চুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সীমিত করলেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলে ইরান পুনরায় উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ইরানের দৃষ্টিতে পরমাণু কর্মসূচি কেবল প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতীক। ফলে ইরান কখনোই পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে ইরানের ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক জোটের অংশ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি ‘ইরান–চীন–রাশিয়া অক্ষ’—যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরানের সামরিক কাঠামো
ইরানের সামরিক কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক। এখানে দুটি সমান্তরাল সামরিক বাহিনী রয়েছে—ইরানিয়ান আর্মি (Artesh) এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। আর্মি রাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক বাহিনী, যার দায়িত্ব সীমান্ত রক্ষা, প্রচলিত যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষা। অন্যদিকে আইআরজিসি একটি আদর্শিক ও বিপ্লব-রক্ষাকারী বাহিনী, যার দায়িত্ব আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ইরানের বৈদেশিক সামরিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা।
আইআরজিসির অধীনে থাকা কুদস ফোর্স ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া পরিচালনা করে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ইরানকে বহুমুখী অপ্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দেয় এবং দেশটিকে নিজের সীমানার বাইরে গিয়েও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে।
ইরানের সামরিক কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা। বিপ্লব-পরবর্তী চার দশকের নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা থেকে ইরান এই ধারণায় পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যেকোনো সময় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমান ধীরে ধীরে ইরানের কৌশলগত সংস্কৃতি ও প্রতিরক্ষা নীতির স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে স্থানীয় কমান্ডাররা প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামরিক প্রতিক্রিয়া থেমে যায় না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এই কাঠামোর কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।