আওয়ামী লীগ কি আসলে রাজনীতিতে ফিরতে চায়
দেশের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ লোক শহরে বা পৌর এলাকায় বাস করে। তারাই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতি ঠিক করে দেয়। তারা আজতক কোনো বিষয়ে একমত হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই। একটা কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি—জাতীয় ঐকমত্য। এটা যে একটি সোনার হরিণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পাঁচজন লোক একত্র হলে কোনো বিষয়ে আলাপ করতে গেলে ছয়টা মত হয়। পাঁচজনের পাঁচ মত। সবার মত শুনে প্রথম জন আবার তার মত বদলায়।
তারপরও আমরা ঐকমত্যের কথা বলি। বলতে হয়। না হলে রাজনীতি হয় না। তবে আমরা জানি, এটি একটি কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা আমাদের কথা বলে যাই। বলার সময় বলি, জনগণ এটা চায়। এই জনগণ অবিভাজ্য নয়। তার মধ্যে অনেক ভাগ। একেক ভাগের একেক রকম মত, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়েও শতভাগ ঐকমত্য নেই, সেটা বোঝা যায়।
আমরা অনেক সময় বলি, একাত্তরে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। শুনতে ভালো লাগে। আসলে এটা একটা মিথ। আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম না। আমরা অনেকে স্বাধীনতা চেয়েছি, অনেকে চাইনি, অনেকে জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়েছি, অনেকে চুপ থেকেছি। তারপর দেশ একসময় পাকিস্তানমুক্ত হলো। আমরা যার যার ন্যারেটিভ তৈরি করতে থাকলাম। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। কয়েকটি ন্যারেটিভ তো রীতিমতো সাংঘর্ষিক।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের লোকেরা লুটেরা, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট—এ অভিযোগ আছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি পারিবারিক শাসন কায়েম করেছিল। সবই সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি? দলটির অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা আছে।
অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। অনেকেই বিদেশে চলে গেছেন। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। চব্বিশের গণবিদ্রোহে বিভিন্ন স্থানে সরকারি বাহিনীর গুলিতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় প্রতিটি মামলায় আসামি হয়তো এক হাজার বা তারও বেশি। শুনেছি, অনেক জায়গায় অতি উৎসাহী ও সুযোগসন্ধানী লোকেরা ইচ্ছেমতো নাম বসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ এসব মামলা গ্রহণ করেছে।
হরেদরে হত্যা মামলা দেওয়ার কারণে আদালতে এসব মামলা টেকানো যাবে না। সামরিক শাসন থাকলে যা খুশি করা যায়। সামরিক আইনের বিরুদ্ধে আপিল চলে না। কিন্তু দেশে একটা সিভিল সরকার থাকলে তাকে আইন মেনে চলতে হয়। ফলে দেখা যাবে, বেশির ভাগ হত্যা মামলার আসামি খালাস পেয়ে যাবে। জানি না, এদের ছেড়ে দেওয়ার জন্যই এভাবে মামলা সাজানো হয়েছে কি না। অথচ মামলা হতে পারত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিয়ে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটা ছিল গোলমেলে। ‘জনগণ এটা চায়’—এই ধুয়া তুলে একটা ছোট দলের কিছু লোককে দিয়ে মিছিল করিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে আওয়ামী লীগের ‘কার্যক্রম’ নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করে দেয়। এটা কি আদালতের নির্দেশ বা রায় ছিল? এমনটি তো শুনিনি। বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের ইচ্ছায়।
এখন এই কমিশন নিজেকে যতই স্বাধীন বলে দাবি করুক না কেন, তা কল্কে পাবে না। অথচ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকার আদালতে যেতে পারত। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জারি করা অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে।
এ দেশের জনমত কী বলে? জনমত কি পত্রিকার সংবাদ পড়ে আর কোনো রাজনীতিবিদের দাবি শুনে বোঝা যায়? এ নিয়ে কি কোনো শুমারি হয়েছে? একটি দলকে জনগণ চায় কি চায় না, সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হলো নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকেরা কোনো দলকে গ্রহণ করেন, কোনো দলকে বর্জন করেন। এটা নাগরিকের সার্বভৌম অধিকার। সরকার এই অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
সুতরাং আওয়ামী লীগ এটা বলতেই পারে যে জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাদেরকে নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে দুটো উদাহরণ তুলে ধরা যায়; এক. ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিল। দুই. ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে শেখ হাসিনার ‘নির্বাচিত’ সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। ফল কী হয়েছিল, সবাই জানেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক দল
- কার্যক্রম
- ফেরা
- আওয়ামী লীগ