দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয় দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলটি ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ বিজয় বিএনপির জন্য যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর একটি বড় প্রত্যাবর্তন, তেমনই নতুন সরকারের সামনে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার বড় দায়িত্বও তৈরি করেছে। সরকার ইতোমধ্যে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। সরকারের প্রথম এ ছয় মাস রাষ্ট্রপরিচালনায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এরই মধ্যে নানা ধরনের বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের প্রথম এ ছয় মাসকে কেবল সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সরল মানদণ্ডে বিচার করলে বাস্তবতার পুরো চিত্রটি সামনে আসবে না। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান, গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকট-এসবের মধ্য দিয়েই নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা যেমন অনেক, তেমনই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, বিনিয়োগের স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া-সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভিত এখনো যথেষ্ট নড়বড়ে। এ সংকটের সব দায় বর্তমান সরকারের ওপর চাপানো যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনই আগের সরকারের রেখে যাওয়া সংকটের কথা বলে বর্তমান সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়াও যথাযথ হবে না বলে অনেকে মনে করেন।
এ বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ছিল সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বলে মনে করলেও বিনিয়োগ, করনীতি, রাজস্ব আদায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল সমস্যা হলো, বাজেটে ভালো পরিকল্পনা থাকলেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায় না। তার জন্য দরকার ব্যবসায়ীদের আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা। সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে মব সংস্কৃতির উত্থান হয়েছিল, তার পুরোপুরি অবসান এখনো ঘটেনি। জনতার হাতে বিচার, দলবদ্ধ হামলা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে, জনগণ তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চায়। আগের সরকারের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। কিন্তু দুর্নীতি দমন যদি কেবল অতীতের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও সম্পদ অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। দুর্নীতির মূল জায়গাগুলোয় আঘাত করতে হবে-সরকারি ক্রয়, ভূমি প্রশাসন, কর, ব্যাংকিং, উন্নয়ন প্রকল্প, লাইসেন্স, নিয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব। জনগণ দেখতে চায়, আগের সরকারের দুর্নীতির বিচার যেমন হচ্ছে, বর্তমান সরকারের সময়ও একই ধরনের অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
বিরোধী দলের ভূমিকাকেও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা প্রয়োজন। গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, সরকারের ভুল তুলে ধরবে এবং জনগণের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করবে-এটাই স্বাভাবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচারণাও থাকবে। প্রতিটি সমালোচনাকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসাবে চিহ্নিত করা তাই কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার বিরোধী দলও যদি প্রতিটি ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, সেটিও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। কিন্তু সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-বিরোধী দলের প্রচারণা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সরকারের নিজের দুর্বলতা থাকে। সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে, অর্থনীতিতে স্বস্তি আনতে পারে এবং প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্রচারণাই স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব হারাবে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন গণতন্ত্রের একটি অংশ; কিন্তু গণতন্ত্রের পূর্ণতা আসে তখনই, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় সরকারের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।