যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি: বাংলাদেশকে সুরক্ষা দেবে, নাকি নতুন শত্রু ডেকে আনবে?

বিডি নিউজ ২৪ ড. মঞ্জুরে খোদা প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১১

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সর্বদাই সংকটাপূর্ণ। একদিকে কৌশলগত নিরাপত্তা ও সামরিক আধুনিকায়নের সুযোগ, অন্যদিকে স্বাধীন অবস্থান হারানোর আশঙ্কা—বাংলাদেশ এখন ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।


তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তায় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্রুততর করার তাগিদ সেই বাস্তবতারই সূচনা। বাংলাদেশ কি স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারছে, নাকি কোনো এক পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে?


এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আকসা (ACSA) ও জিসোমিয়া (GSOMIA) চুক্তি দুটির প্রকৃতি বোঝা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা এবং বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে যে, সরকার এই চুক্তি দুটি সম্পাদন করার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।


তাত্ত্বিক কাঠামো


১. কিসিঞ্জারের বাস্তববাদ ও শক্তির ভারসাম্য


হেনরি কিসিঞ্জার তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিপ্লোমেসি’তে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তববাদী পাঠ উপস্থাপন করেন। তার মতে, রাষ্ট্রগুলো মূলত জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখাই আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। কিসিঞ্জার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই নৈতিক আদর্শবাদের আবরণে জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যায়।


“No country can act wisely simultaneously in every part of the globe at every moment of time.” — Henry Kissinger, Diplomacy, 1994


এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তিকে বোঝা যায়: যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে আঞ্চলিক মিত্র তৈরি করছে, যেখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত মূল্যবান।


২. জোসেফ নাই ও তার স্মার্ট পাওয়ার তত্ত্ব


হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই তার ‘সফট পাওয়ার ও দ্য ফিউচার পাওয়ার’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি (হার্ড পাওয়ার) দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ‘স্মার্ট পাওয়ার’—অর্থাৎ হার্ড ও সফট পাওয়ারের সুচিন্তিত সমন্বয়।


বাংলাদেশের জন্য এই তত্ত্বের প্রয়োগ হলো: কেবল বৃহৎ শক্তির চাপে নত হওয়া নয়, বরং নিজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও কূটনৈতিক দক্ষতাকে পুঁজি করে চুক্তিগুলোকে নিজের শর্তে সম্পাদন করা।


৩. কেনেথ ওয়ালজের কাঠামোগত বাস্তববাদ


নিও-রিয়েলিস্ট তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়ালজ তার ‘থিউরি অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স’ গ্রন্থে দেখান যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈরাজ্যিক কাঠামোই রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তার সন্ধানে বাধ্য করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ছোট রাষ্ট্রগুলো সাধারণত দুটি কৌশল নেয়: বড় শক্তির সঙ্গে জোট গঠন অথবা পাল্টা শক্তির সঙ্গে মিত্রতা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হলো উভয় কৌশলের মাঝামাঝি—কৌশলগত নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচনি অংশীদারত্ব।


ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ইন্দো-প্যাসিফিক ও বাংলাদেশের অবস্থান


১. মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল


২০১৭ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন এবং পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ ঘোষণা করে। ২০২২ সালে প্রকাশিত মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নথিতে বলা হয়: "The most consequential geopolitical contest of our era is taking place in the Indo-Pacific."


এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে প্রতিসাম্য প্রদান করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র QUAD (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত), AUKUS (অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র) এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি ‘নিরাপত্তা জাল’ বিস্তার করছে। বাংলাদেশ এই জালের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত।


২. বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব


বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। প্রতি বছর প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এই সাগর দিয়ে প্রবাহিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও ভবিষ্যতের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এই সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। দ্য ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার বিশ্লেষক শ্রেয়া আগরওয়াল ২০২৩ সালে লিখেছেন, "The Bay of Bengal is increasingly becoming a focal point of great power competition, with China's String of Pearls strategy and the US-India partnership both vying for influence. Bangladesh sits at the geographic heart of this contest."


এই বাস্তবতায় আকসা চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বঙ্গোপসাগরে লজিস্টিক সুবিধা দেওয়ার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যা ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করতে সহায়ক।


৩. চীনের 'স্ট্রিং অব পার্লস' ও বাংলাদেশ


চীনের 'মুক্তার মালা' কৌশলের আওতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে বন্দর ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ রয়েছে। পাশাপাশি চীন BRI-র (Belt and Road Initiative) আওতায় বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।


ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীন থেকে মোট সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭২ শতাংশ আমদানি করে। এই নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর বেইজিংয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করবে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব কূটনৈতিক ঝুঁকি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও