গণতন্ত্রের সম্ভাবনাময় সূচনা, রাষ্ট্র গঠনের নতুন লড়াই
গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য ন্যূনতম যে শর্তটি অপরিহার্য, তা হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক বিধান নয়, এটি নাগরিক মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু। ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রকৃত পালাবদল ঘটেনি। এর ফলে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা হলো ক্ষমতার পালাবদলের অনুপস্থিতি, একদলীয় প্রাধান্য এবং ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। ইতিহাস বলে, যখন জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ সংকুচিত হয়, তখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জবাবদিহির বিষয়টি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমে নাগরিকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে।
আমরা অতীতেও গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটিয়েছি, কিন্তু গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোর একীভূতকরণ নিশ্চিত করতে পারিনি। ফলে নতুন করে আমাদের আবারও গণতান্ত্রিক সংকটে পড়তে হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে আবার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এবারের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্গঠনের একটা পরীক্ষাও।
এই নির্বাচনের দুটি মাত্রা রয়েছে। প্রথমত, এটি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। নাগরিকেরা ভোট দিয়ে তাঁদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ পাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, এটি একধরনের গণ-অনুমোদন। রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কারে যে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে, জনগণ তা সমর্থন করছে কি না, সেটিও এই প্রক্রিয়ায় যাচাই হচ্ছে।
নির্বাচনের দিনে কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়মের খবর এসেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কখনো শতভাগ স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু ভোট হয়েছে বলা যাবে না। এটি আশা করাটাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রশ্ন হলো, অনিয়মের মাত্রা কি এই পর্যায়ের যে এটা সামগ্রিক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে? এখন পর্যন্ত যে প্রবণতা দৃশ্যমান, তাতে বড় কোনো কারচুপির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এটি একটি ইতিবাচক দিক।
একই সঙ্গে ভোটার উপস্থিতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেও চলবে না, সেটি অংশগ্রহণমূলকও হতে হবে। নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। একটি বড় দল যেহেতু ভোটের মাঠে নেই, ফলে ভোট গ্রহণের হারে এর প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাব বলছে, ভোটার উপস্থিতি হয়তো ৬০ শতাংশের কাছাকাছি বা কিছুটা বেশি হতে পারে। একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও যদি এই হার অর্জিত হয়, তবে তা পুরোপুরি নিরাশাজনক নয়। অবশ্যই আরও বেশি অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করত। তবু এটিকে একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলা যায়।
কোনো সহিংসতা ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। আশা করি, ভোটের ফলাফলের বিষয়টিও ইতিবাচক হবে। ভোট গ্রহণের দিন রাজনৈতিক দলগুলো যে স্বতঃস্ফূর্ততা, ধৈর্য ও সংযম দেখিয়েছে; আশা করি ভোটের ফলাফল নিয়েও তারা একই মনোভাবের পরিচয় দেবে। ফলাফল যা–ই হোক, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। আমরা দীর্ঘদিন উইনার টেকস অল বা জয়ী দলই সব নিয়ে নেয়—এমন সংস্কৃতির ভেতর ছিলাম। নতুন প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কার্যকর ভূমিকার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও উপলব্ধি করতে হবে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ একটি যৌথ প্রক্রিয়া।
এই নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত আছে গণভোটের প্রশ্ন। গণভোট ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হবে। জুলাই সনদে যে প্রস্তাবগুলো রয়েছে, যেমন উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপদ্ধতির সংস্কার, সেগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংসদ ১৮০ দিনের জন্য একটি গাঠনিক ক্ষমতা লাভ করবে, যার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন সম্ভব হবে। এই সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতি-স্পষ্টতা এবং আন্তদলীয় সমঝোতা অপরিহার্য।
নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে গণভোটের রায়ের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান প্রদর্শন। জনগণ যদি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট রায় দেয়, তবে তা বাস্তবায়নে গাফিলতি করলে শুরুতেই সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলও তখন কঠোর অবস্থান নেবে। যে দল বা জোটই নির্বাচনে জিতুক, এবার বিরোধী দল দুর্বল হবে বলে মনে হয় না। ফলে ১৮০ দিনের ভেতরে যদি সংস্কার প্রশ্নে অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে আমরা আবার সংঘাতমুখী রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারি। আরব বসন্ত-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সংকটকালে ঐকমত্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক যাত্রা থেমে যায় এবং আবার কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র। গত দেড় দশকে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক রাজনীতিকরণ হয়েছে। মেধাভিত্তিক পেশাদারির পরিবর্তে আনুগত্যনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এর ফলে প্রশাসনের মনোবল ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে আমলাতন্ত্রের ভেতরেও রাজনৈতিক বিভাজন দৃশ্যমান। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাকে এই প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিটি দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর অনেকগুলো বাস্তবায়নযোগ্য নয়, অনেকগুলো চাইলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটি নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। আমলাতন্ত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্নির্ধারিত হবে, নীতিমালা কীভাবে সংশোধিত হবে, সেটিই আগামী কয়েক বছরের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে।