রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার : আগামীর প্রত্যাশা
রোহিঙ্গা সংকট আট বছর পেরিয়ে গেলেও এ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। গত এক বছরে মিয়ানমার ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় এ সংকট সমাধানে মিয়ানমার প্রান্তে কোনো উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশের চেষ্টায় প্রথম ধাপে মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়, কার্যকর না হলেও এটি ছিল রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। রোহিঙ্গাদের কারণে দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিকভাবে নিরাপত্তা সংকট, মাদক ব্যবসা, অপহরণের ঘটনায় পর্যটন শিল্পের ওপর হুমকি বাড়ছে। মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচার, বাংলাদেশের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের উত্থানের মতো নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। রাখাইন রাজ্যে পরাশক্তিগুলোর উপস্থিতি ও বিনিয়োগ এবং স্বার্থরক্ষার উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশকেও নিজস্ব স্বার্থরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং এ সমস্যা সমাধান ও বহির্বিশ্বের অগ্রগতি ও প্রচার চালিয়ে যেতে বাংলাদেশকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের বাসভূমি মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে তারা তাদের রাখাইন ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। একদিকে রাখাইন রোহিঙ্গাশূন্য হওয়ার পথে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে স্থানীয় জনগণ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। দ্রুত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দরকার। মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের অধিকার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। মিয়ানমার ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য।
মিয়ানমারের সাধারণ জনগণ পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে চরম বিপর্যস্ত এবং এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য এমএনডিএএ ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি চীনের মধ্যস্থতায় নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে পরবর্তীকালে অক্টোবর মাসে টিএনএল এ চীনের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এ যুদ্ধবিরতির পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী মান্দালয়, কাচিন, চিন, কারেন এবং রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সৈন্য সমাবেশের সুযোগ পায়। মিয়ানমার জান্তা তাদের যুদ্ধকৌশলেও পরিবর্তন এনে বিদ্রোহীদের ওপর চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত ড্রোন আর জ্যামার ব্যবহার শুরু করেছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্মম নির্যাতন ও সহিংসতার জেরে আর্জেন্টিনায় রোহিঙ্গাদের একটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার একটি আদালত মিন অং হ্লাইং, সাবেক প্রেসিডেন্ট টিন কিয়াও এবং অং সান সু চিসহ বেশ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সময়ে এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি বিজয়।
মিয়ানমারে এক মাস ধরে তিন দফায় চলমান নির্বাচন ২৫ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় দল এনএলডিসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি উদ্যোগ বলে জানায় এবং ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্য এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। মিয়ানমারের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক সমস্যা এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার ও রাখাইনে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা আবশ্যক। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রতি আরাকান আর্মির মনোভাব পরিবর্তন জরুরি। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে মিয়ানমার ও আরাকান পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর প্রভাব ফেলবে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে এবং এখনো এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশে বেশ তৎপর; কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরে তাদের তৎপরতা তেমন দৃশ্যমান নয়। আরাকান আর্মি প্রধান জানান, যেসব অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেসব এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকে করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কাজ করতে একমত হয়েছে। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও মানসিকতার পরিবর্তনে সময়ের দরকার, চাপ প্রয়োগ কিংবা দ্রুত এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। রাখাইনের উন্নয়নের চাকা ত্বরান্বিত করতে হলে রোহিঙ্গা রাখাইন সংঘাত বন্ধ করে সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আরাকান আর্মিকে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গা রাখাইন সহাবস্থানের জন্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে সহনশীলতা ও আস্থার জায়গা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শরণার্থী
- সংকট সমাধান
- রোহিঙ্গা ইস্যু