‘ঘাড় ভাঙা’ অর্থনীতির দেশে রাজকীয় বিলাসিতা

বিডি নিউজ ২৪ পারভেজ আলম প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৯

ঢাকার ওসমানী উদ্যানে আবছা আলোয় গৃহহীন এক বৃদ্ধ যখন একটি পলিথিন টেনে নিজের ও স্ত্রীর শরীর ঢাকার চেষ্টা করেন, তখন কি তিনি জানেন, তারই দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য ৯ হাজার ৩০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট তৈরির পরিকল্পনা চলছে? নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি আজ ফুটপাতে আশ্রয় নিয়েছেন, কিন্তু তারই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল আবাসন গড়ে তোলা হচ্ছে।


লাখো মানুষের মাথার ওপর ছাদ নেই, অথচ প্রস্তাবিত ওই নতুন ভবনগুলোর ছাদে থাকবে নীল জলের সুইমিংপুল। বৈষম্যের চরম এই চিত্র দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, এ কোন রাষ্ট্র? কার জন্য এই উন্নয়ন? যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই বা দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের চিন্তায় দিশেহারা, সেখানে এমন রাজকীয় বিলাসিতা কি শুধুই নীতিহীনতার প্রকাশ নয়? সরকারের অগ্রাধিকার দেখে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের চেয়ে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তোষণই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তথাকথিত উন্নয়নের ছবিতে সাধারণ মানুষের স্থান কোথায়?


অন্তর্বর্তী সরকারের নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ দেখে অর্থনীতিবিদরা রীতিমতো আঁতকে উঠছেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন গড়ে ১০৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, নিম্ন গ্রেডে (২০তম) তা ১৪০-১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। এটা বাস্তবায়িত হলে আগামী সরকারের কাঁধে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপবে। বর্তমানে ১৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্যই খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থায় আরও এক লাখ কোটি টাকার ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা কি আমাদের অর্থনীতির আছে?


অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, রাজস্ব আদায়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি, ব্যাংক বাঁচাতে ২০ হাজার কোটি টাকা ঢালতে হচ্ছে—এ অবস্থায় এমন বেতনবৃদ্ধি রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সরকারের ‘ঘাড় তো আগে থেকেই ভাঙা’, এখন আর কত বোঝা চাপবে? বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর যুক্তি অতীতে কাজ করেনি। উল্টো এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং তার খেসারত দিতে হবে স্বল্প আয়ের মানুষদের।


বৈষম্যের এই খেলা কেবল বেতনেই থেমে নেই, আবাসন প্রকল্পেও যা প্রকট। বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে গণপূর্ত অধিদপ্তর যে তিনটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, তাতে ৭২টি ফ্ল্যাটের প্রতিটির আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। সাধারণ উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষ যেখানে দেড় হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে থাকে, সেখানে মন্ত্রীদের জন্য এর প্রায় ছয় গুণ বড় ফ্ল্যাট বানানো হচ্ছে। এমনকি সরকারি নিম্নপদের কর্মচারীরা যেখানে মাত্র ৬৫০ বর্গফুটের বাসায় মাথা গুঁজতে বাধ্য হন, সেখানে মন্ত্রীদের এই ফ্ল্যাট হবে তাদের চেয়ে ১৪ গুণ বড়। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, বর্তমানে মন্ত্রীদের জন্য ঢাকায় ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট নির্ধারিত আছে এবং অনেকগুলোই এখন খালি পড়ে আছে। তার পরও কেন ৭৮৬ কোটি টাকা খরচ করে নতুন করে সুইমিংপুলসহ এই প্রাসাদ বানাতে হবে?


শুধু সুইমিংপুলের সরঞ্জাম কিনতেই খরচ ধরা হয়েছে তিন কোটি টাকা, আর পর্দা ও আসবাবপত্রের জন্য ২০ কোটি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক ঠিকই বলেছেন, যে দেশে চার কোটি মানুষ দরিদ্র, সেখানে মন্ত্রীদের জন্য এমন বিশাল ফ্ল্যাট নির্মাণ করা অত্যন্ত বেমানান।


সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, ব্যাংকের টাকা লুট করা অনেক ব্যক্তিই আবার সংসদে যাওয়ার দৌড়ে নেমেছেন। আসন্ন নির্বাচনে ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী রয়েছেন—বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের। চট্টগ্রামের এক প্রার্থীর মাথায় ১,৭০০ কোটি টাকার ঋণ, করছেন বুক ফুলিয়ে নির্বাচন। আইনের ফাঁকফোকরে মাত্র ১০ শতাংশ টাকা জমা দিয়েই এই ঋণখেলাপিরা প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ক্ষমতায় গেলে তারা নিজেদের ঋণ মওকুফ করাবেন বা বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবেন—এটাই অতীতের শিক্ষা। জনগণের টাকা ব্যাংকে ফিরে না আসায় ব্যাংকগুলো আজ সংকটে, অথচ ওই টাকার ওপর ভর করেই খেলাপিরা ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখছেন।


ঋণখেলাপিরা ব্যাংক খালি করছে, সরকার ফ্ল্যাট-সুইমিংপুলে বানাতে ব্যস্ত—আর আমরা চাল-ডালের দাম নিয়েই পাগল হয়ে যাচ্ছি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক লাফে ১০০-১৪০ শতাংশ বাড়লে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। যদিও অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, সরবরাহ ঠিক থাকলে প্রভাব পড়বে না, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এক লাখ কোটি টাকার এই বাড়তি খরচ জোগান দিতে সরকারকে পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই টাকা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এক লাফে কয়েক ধাপ বেড়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।


সরকারি কর্মকর্তারা হয়তো বর্ধিত বেতন দিয়ে এই বাড়তি দাম সামাল দেবেন, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কোথায় দাঁড়াবে তা কি সরকার ভেবেছে একবার? এক লাখ কোটি টাকা কেবল সুবিধাভোগীদের পকেটে ঢোকানোর তোড়জোড় চলছে, তখন রাষ্ট্রের নীতির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ছাড়া আর উপায় থাকে না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও