ভবিষ্যতের ‘লাল জুলাই’ এড়ানোর অর্থনৈতিক পথ কী
বাংলাদেশে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বড় হচ্ছে। বাজেটের আয়তন বাড়ছে। ৫৪ বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়নও অনেক হয়েছে; কিন্তু সমাজে আয়বৈষম্য ও ধনবৈষম্য ব্যাপক এখানে। এই বৈষম্যই সামাজিক শান্তির মুখ্য শত্রু; যদিও মানুষের মনোযোগ সরিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক যুদ্ধ লাগানো আছে।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের ‘বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদনে’ বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, এখানে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিক সমাজের ওপরতলার ১০ শতাংশ ধনী। শীর্ষ ১ শতাংশের কাছে রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় ২৫ ভাগ। নিচুতলার ৫০ ভাগ মানুষের কাছে আছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আয়ের ক্ষেত্রেও তীব্র অসমতা চলছে। জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ চলে যায় শীর্ষ উপার্জনকারী ১০ শতাংশের হাতে। নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষ সবাই মিলে আয় করে মাত্র ১৯ শতাংশ।
অর্থনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা গোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়। প্রশাসনকেও তারা বেশি প্রভাবিত করতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতিদের একচেটিয়া আধিক্য দেখা যাচ্ছে। একটি বড় দলে ৭৫ ভাগ প্রার্থী কোটিপতি। ক্ষমতা পেয়ে ধনী রাজনীতিবিদেরা তাঁদের জন্য সুবিধাজনক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই রক্ষা করতে চাইবেন। ফলে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনে’ও অর্থনীতির বৈষম্যপীড়িত চিত্র হয়তো সামান্যই বদলাবে এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশকে সম্ভাব্য আরেক ‘লাল জুলাই’য়ের ঝুঁকিতে থাকতে হবে।
নাগরিক সমাজের একাংশ মাঝেমধে৵ এ রকম প্রশ্ন তোলে, বৈষম্য কীভাবে কমানো যাবে, সবার স্বার্থে পর্যাপ্ত উন্নয়নের দেশজ সম্পদের জোগান কোথায়? বৈষম্যের পাশাপাশি সম্পদের স্বল্পতা প্রকৃতই পরস্পর সংযুক্ত সমস্যা। তবে সম্পদ বাড়ানো সম্ভব এবং বৈষম্য কমাতে হলে কেবল সম্পদের জোগান যথেষ্ট নয়, বৈষম্য কমানোর উপায় নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
শুরুর কাজ
বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। টাকার অঙ্কে যা সাড়ে তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। এই আয় হিসাব হয় জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। মাথাপিছু আয়ের বড় অঙ্ক দেখিয়ে নীতিনির্ধারকেরা বাহবা পেলেও এতে সমাজের নিচুতলার আয়ের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। কারণ, দেশে অন্তত ২০ ভাগ মানুষ যে দরিদ্র, সেটিও সমকালীন বহু গবেষণায় জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ কম করে হলেও তিন-চার কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, যারা গবেষকদের মানদণ্ডে মাসে খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ৩ হাজার ৮২২ টাকাও খরচ করতে পারছে না।
একদিকে অনেক দরিদ্র, অন্যদিকে গড় আয়ের মোটাতাজা চিত্রে স্পষ্ট, এখানে আয় ও সম্পদের বিপুল বৈষম্যের পাশাপাশি একদল মানুষ বিপুল আয় করে। বিপুল সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে তাদের হাতে। অথচ দেশটি প্রতিবছর অতি কম দেশজ সম্পদ নিয়ে উন্নয়ন বাজেট তৈরি করে। এই কম বাজেটের কারণ রাষ্ট্রের আয় কম। একদিকে সমাজে সম্পদবৈষম্য, অন্যদিকে বিপুল সম্পদশালী একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বাংলাদেশে ভয়াবহ ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী তিন আন্তর্জাতিক সংগঠনের ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ট্যাক্সিং এক্সট্রিম ওয়েলথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার ৫৫০ জনের কাছে ৫ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়ে বেশি করে নিট সম্পদ রয়েছে। এর মধে৵ ৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়ে বেশি করে সম্পদ আছে অন্তত ১৯৫ জনের। এই ১৯৫ জনের যৌথ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের সমান, যা নিচুতলার ৫ কোটি বাংলাদেশির সম্পদের চেয়েও ২ দশমিক ৬ গুণ বেশি। গড় সাদামাটা হিসাবে দেখা যায়, এ রকম সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর যদি নতুন করে ৫ শতাংশ সম্পদকর আরোপ করা যায়, তাহলে কেবল ১৯৫ ব্যক্তি থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কর আহরণ সম্ভব। টাকার হিসাবে এটা প্রায় ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।