লিবারেলিজমের মুখোশের আড়ালে সাংস্কৃতিক রাজনীতি

যুগান্তর ড. হাসান মাহমুদ প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৯

বাংলাদেশে লিবারেলিজম (liberalism) তথা ‘উদারবাদ’, ‘স্বাধীনতা’, ‘প্রগতিশীলতা’ ও ‘গণতন্ত্র’-এ শব্দগুলো গত এক দশকে পাবলিক আলাপে-বিতর্কে সবচেয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক এলিট, একাডেমিয়া ও গণমাধ্যম-সবাই যার যার মতো নিজেদের উদার ও মুক্তচিন্তার ধারক হিসাবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এ উদারতাবাদ কি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়েছে, নাকি এটি ক্ষমতার এক বিশেষ ভাষা, যার আড়ালে দমন, বৈষম্য ও কর্তৃত্ব টিকে ছিল?


বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তক ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন কিন সাম্প্রতিক এক বক্তৃতা ‘Liberal Illusions, Liberal Failures; or Why I Am Not a Liberal’-এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঠিক এ প্রশ্নটিই তুলেছেন। তার বক্তব্যের সারকথা হলো-উদারবাদ ঐতিহাসিকভাবে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা শ্রেণিভিত্তিক, বর্ণভিত্তিক ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সঙ্গে সহাবস্থান করেছে-গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে সংকুচিত করেছে এলিট প্রতিযোগিতায়, বাজারমুখী সংস্কারকে বৈষম্য ও ঋণের কাঠামোয়, আর অধিকারভিত্তিক ভাষাকে পরিণত করেছে মানবিক সহানুভূতির প্রদর্শনীর ফাঁকা বুলিতে। আর এসব করতে গিয়ে উদারতাবাদ সমাজের কাঠামোগত অবিচার ও বৈষম্যের প্রশ্নকে রেখেছে জনতার মনোযোগের বাইরে।


এ সমালোচনাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করলে দেখা যায়, আমরা কেবল একটি শাসনব্যবস্থার পতন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ব্যবস্থার সংকট প্রত্যক্ষ করছি।


উদারতাবাদী দাবি ও বাস্তব জীবনের ফাঁক


গত এক দশকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের ‘উদার’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘মুক্তচিন্তার’ রক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। রাষ্ট্রীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, এনজিও প্রতিবেদন-সবখানেই এ ভাষা ছিল প্রবল। কিন্তু একই সময়ে যাপিত জীবনের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।


নাগরিক অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আইনি ও অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করা হয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে। শাসনব্যবস্থা রূপ নিয়েছে এক ধরনের মাফিয়া-পৃষ্ঠপোষক নেটওয়ার্কে, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যই ছিল নিরাপত্তা ও সুযোগের শর্ত।


জন কিন যেমন বলেন, উদারবাদ সংবিধান, আইন ও বাজারের আড়ালে ক্ষমতার বাস্তব রূপকে অদৃশ্য করে তোলে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে। আর বাংলাদেশে সেটাই ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে উদারতা, উন্নয়ন আর স্বাধীনতার ভাষা ব্যবহার হয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্র পরিণত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতায়, দলীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসাবে।


সংস্কৃতির রাজনীতি : আধুনিক বনাম মধ্যযুগ


আওয়ামী লীগের সেই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার ছিল সাংস্কৃতিক রাজনীতি। একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা হয়-আধুনিক বনাম মধ্যযুগীয়, প্রগতিশীল বনাম প্রতিক্রিয়াশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বনাম বিপক্ষ। এ বিভাজনের এক পাশে অবস্থান নেয় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও তাদের অনুগত সাংস্কৃতিক এলিটরা; অপর পাশে ঠেলে দেওয়া হয় যে কাউকে, যিনি প্রশ্ন তোলেন বা ভিন্নমত পোষণ করেন।


ফলে রাজনীতি আর নীতি বা কর্মসূচির বিতর্ক থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে পরিচয়ের বিচার। সংস্কৃতি এখানে মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র না হয়ে উঠেছে শাসনের নৈতিক ঢাল। ভিন্নমত মানেই ‘পিছিয়ে পড়া’, ‘উগ্র’ কিংবা ‘হুমকি’। এ ভাষা ব্যবহার করে সামাজিক বৈধতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বহু মানুষের।


জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা


২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এ অন্যায্য, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কর্মসংস্থান, বৈষম্য, রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয় চরম সহিংসতার মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় কাঠামোর সম্মিলিত ভূমিকা বহু প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্ম দেয়।


এখানেই উদারতাবাদের মুখোশ পুরোপুরি খুলে পড়ে। যে রাষ্ট্র নিজেকে মানবাধিকারের রক্ষক বলে দাবি করছিল, সেই রাষ্ট্রই নাগরিকদের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক বয়ানে এ সহিংসতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘রাষ্ট্র রক্ষার প্রয়োজন’ হিসাবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও