শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’: নামেই যেন কাঁপুনি
এবারের শীত মৌসুমে প্রথম শৈত্যপ্রবাহ আসছে ‘কনকন’ নাম ধারণ করে। বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ‘এই শৈত্যপ্রবাহ কয়েক দিন ধরে দেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে।’ শীত বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে নামটা উচ্চারণ করলেই গায়ে কাঁটা দেয় তা হচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। আর সেটার নাম যদি কনকন হয়তো আর কোনো কথাই নেই! কারণ, এই নামের মধ্যেই যেন শীতের কাঁপুনি আর আগুন জ্বালানোর তাড়না লুকিয়ে আছে। কনকন-এর মতো শৈত্যপ্রবাহ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, শীত বাংলাদেশের এমন একটি ঋতু যা ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে নানা বৈপরীত্য জানান দিতে আসে আর সেটাই অনেকের জন্য এটি এক কঠিন বাস্তবতা।
শহরের মানুষের কাছে শীত মানে হয়তো আরাম, কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম, কিংবা গরম চায়ের কাপ। কিন্তু গ্রামগঞ্জের দরিদ্র মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের কাছে শীত মানে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে শীত মানেই এক ধরনের বৈপরীত্য। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে শীত মানে উৎসব, ভ্রমণ আর ফ্যাশনের উপলক্ষ্য। অথচ গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, ভাসমান জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষের কাছে শীত মানে কষ্ট, অসুস্থতা এবং কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর লড়াই। এবারের সাত দিনব্যাপী ঠান্ডা কনকন শৈত্যপ্রবাহ সেই বাস্তবতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা মাঠ, চর এলাকা ও নদীঘেঁষা অঞ্চলে শীতের কামড় সবচেয়ে নির্মম হয়ে উঠতে পারে বলে ইতোমধ্যে ধারণা করা হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগে শীতের তীব্রতা বরাবরই বেশি। উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস আর কম আর্দ্রতা মিলিয়ে শীত এখানে যেন আরও ধারালো। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে কুয়াশা ও আর্দ্রতার কারণে ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে তখন বাড়তি চাপ পড়ে, অথচ সেখানকার প্রস্তুতি অনেক সময়ই পর্যাপ্ত থাকে না।
রাজশাহী বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শীতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, কম আর্দ্রতা এবং উত্তর দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস শীতকে আরও কনকনে করে তোলে। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে শীতের সঙ্গে যুক্ত হয় ঘন কুয়াশা ও আর্দ্রতার প্রভাব, যা স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি এবং হৃদ্রোগজনিত জটিলতা বাড়ে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে, যা আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আমাদের দেশে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শৈত্যপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কৃষিখাতে এর প্রভাব সরাসরি ও বহুমাত্রিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও। কৃষিখাতে বোরো ধানের বীজতলা, শাকসবজি ও অন্যান্য রবি ফসল শীতের তীব্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কুয়াশার কারণে সূর্যালোক কমে গেলে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দিনমজুরদের কাজের সুযোগ কমে যায়, ফলে বাড়ে দারিদ্র্যের চাপ।
কৃত্রিমভাবে মাছ চাষেও কনকনে শীতের প্রভাব পড়ে। পানির তাপমাত্রা কমে গেলে মাছের রোগবালাই বাড়ে। অর্থাৎ কনকন শুধু তাপমাত্রার বিষয় নয়। এটি জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই শীত যেন একদিকে ঠান্ডা বাতাস, অন্যদিকে জীবিকার ওপর জমে ওঠা বরফ। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার দিকেও বেশী নজর দেবার সময় এসে গেছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শৈত্যপ্রবাহ
- নিম্নআয়ের লোকজন