ছবি সংগৃহীত

সচেতনতার অভাবে সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

খোরশেদ আলম
সহ-সম্পাদক, নিউজ এন্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স
প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি ২০১৬, ১৬:১৬
আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৬, ১৬:১৬

(প্রিয়.কম) থামছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াল থাবা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। যার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়াও দুস্কর। এর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করা না হলেও অনিয়ম কিংবা অসচেতনাই মূল কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন মনে করে, দুর্ঘটনার জন্য রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাকে বাদ দেওয়ারও কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৫ সালে সারাদেশে ৬ হাজার ৫৮১টি ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হন। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২১ হাজার আটশ ৫৫ জন। আর ২০১৪ সালে দেশে প্রায় ছয় হাজার সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার এমন চিত্রকে ‘মৃত্যুর এই সংখ্যা ইরাক বা আফগানিস্থান যুদ্ধে মৃত্যুর চেয়ে ‘ভয়াবহ’ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সামগ্রিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলছে না ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনের তত্ত্ব উপাত্ত। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৩ জন নিহত হয়েছেন। আর ২০১৪ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২ হাজার ৭১৩টি। নিহতের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৮২ জন।

ইলিয়াস কাঞ্চন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাজ করা উচিত। 

কিছুদিন আগেই সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রোগ্রামে গিয়েছিলেন জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘তাদের (বিশ্বব্যাংক) হিসাব মতে বাংলাদেশে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমে আসছে।’

২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৮৫টি বাস, ১ হাজার ৬৫৬টি ট্রাক ও ৮৭২টি কাভার্ডভ্যান ও হিউম্যান হলার, ৫৫২টি কার জীপ ও মাইক্রোবাস, ১ হাজার ৬৭৮টি অটোরিকশা, ১ হাজার ৭৭১টি মোটরসাইকেল, ১ হাজার ৭১টি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ১ হাজার ৩৩টি করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

আর শনিবার সকালে চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, হাটহাজারী, জয়পুরহাট ও বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রীর ছেলেসহ ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) দেওয়া তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ২০১৩ সালে ১ হাজার ৭৮২ জন নিহত হন। সরকারের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ছিল ৪ হাজার, আর ২০১৩ সালে দুর্ঘটনা দেখানো হয়েছে ২ হাজার।

এআরআই’র পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে ২ হাজার ৭২ জন মারা যান। ওই বছরের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে নিহত হন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। আর ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬ জন স্কুল শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ২০১০ সালে ২ হাজার ৪৪৩ জন, ২০০৯ সালে ২ হাজার ৭০৩ জন, ২০০৮ সালে ৩ হাজার ৫৭০ জন ও ২০০৭ সালে ৩ হাজার ৩৪১ জন নিহত হন।

সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের জিডিপি’র দেড় থেকে দুই শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য ওই সংগঠনের কর্ণধার মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। মহামারী আকারের এসব দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টি মধ্য আয়ের দেশে যাত্রার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কিছুটা হলেও সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘কুয়াচ্ছন্ন অবস্থায় এখন ফেরি কিংবা বিমানের ফ্লাইট বন্ধ থাকে। কিন্তু বাসের বিষয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, সরকারের উচিত এই সময় বাস চালকদের গতি নির্ধারণ করে দেওয়া। তাহলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা কমে যাবে।’

তবে দেশজুড়ে ঘুন কুয়াশার কারণে যান চলাচলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, জানুয়ারির প্রথমার্ধ বা পৌষ মাসের শেষ সপ্তাহে এমন ঘন কুয়াশা স্বাভাবিক।

নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরকার আমাদের সাজেশন খুব ফলো করে না। আর করলেও তা কয়েকদিনের জন্য স্থায়ী থাকে। মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকার কারণে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। উদাহরণ হিসেব তিনি এসময় মহাসড়কে সিএনজি চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন; যার কার্যকারিতা কয়েকদিন ছিল বলে উল্লেখ করেন ইলিয়াস কাঞ্চন।’

প্রিয়.কম-এর সাথে কথা বলার সময় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কিছু সুপারিশ করেন তিনি:

১. চালকের দায়ীত্বশীল করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

২. এসএসসি পাশ (হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী) দরিদ্র ও বেকার যুবকদের বিনাবেতনে অথবা ঋণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ চালক হিসাবে গড়ে তোলা এবং লাইসেন্স প্রদানের লক্ষ্যে সরকারী উদ্যোগে সকল জেলায় একটি করে ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। 

৩. সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সকল পক্ষকে আইনের আওতায় আনার জন্য বিদ্যমান দণ্ডবিধি সংশোধন ও নতুন ধারা সংযোজন। 

৪. ট্রাফিক আইন মেনে চলা।

৫. চালক নিয়োগ এবং চালকদের জন্য বেতন কাঠামো ও কর্মসময় নির্ধারণ করা।

৬. সকল মহাসড়ক এবং প্রধান সড়কে একমুখী চলাচলের সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ এবং উচ্চতাসম্পন্ন সড়ক বিভাজনকারী তথা রোড ডিভাইডার-এর ব্যবস্থা করা। 

৭. বিভিন্ন মিডিয়ায় মাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে তা বজায় রাখা। 

৮. সড়কের ত্রুটিগুলো অচিরেই দূর করা। 

৯. পথচারীদের নিবিঘ্নে চলাচলের জন্য ফুটপথগুলো দখলমুক্ত করে যেখানে ফুটপাত নেই সেখানে ফুটপাত তৈরীর ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা।

১০. বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের আওতাভূক্ত রাস্তা পারাপারের জন্য বেশি বেশি আন্ডারপাস তৈরী করা। 

১১. ২০১৭ সালে স্কুলের পাঠ্যক্রমে সড়ক দুর্ঘটনারোধের বিষয়সমূহ অন্তর্ভূক্ত করার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তা অবশ্যই বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা। 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ:

১। ফুটপাত দখল।

২। ওভার টেকিং, ওভার স্পিড ও ওভার লোড।

৩। হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো।

৪। রাস্তার নির্মান ক্রটি।

৫। গাড়ির ক্রটি।

৬। যাত্রীদের অসতর্কতা।

৭। ট্রাফিক আইন না মানা।

১০। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ক্রসিংয়ে জেব্রাক্রসিং না থাকা ও জেব্রাক্রসিং গাড়ি চালক কর্তৃক না মানা।

১১। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার করা।

১২। মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যান একই সাথে চলাচল।

১৩। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো।

১৪। মহাসড়ক ক্রসিংয়ে ফিডার রোড এর যানবাহন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তাদের সুপারিশ:

১। ট্রাফিক আইন ও মোটরযান আইন সম্পর্কে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের, মসজিদ, মন্দির, গির্জায় ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা।

২। টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র সমূহে সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা।

৩। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ করা, ফুটপাত দখল মুক্ত করা।

৪। রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রাক্রসিং অংকন করা।

৫। চালকদের প্রফেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা।

৬। চালকদের বিশ্রাম ও কর্ম বিরতির সুযোগ দেওয়া।

৭। বিদ্যমান মোটরযান আইন যুগোপযোগী করা এবং গাড়ীর ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি ডিজিটাল করা।

৮। সড়ক দূর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যারা ছিন্নমূল ও দারিদ্রের কাতারে নেমে যাচ্ছেন তাদের ভরণ- পোষণের দায়-দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণের জন্য প্রস্তাব করছি।

৯। জাতীয় মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেন এর ব্যবস্থা করা।

১০। দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত ট্রমা সেন্টার গুলো দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা।