জামায়াত–কওমির বিরোধ কেন, কোথা থেকে এর শুরু
বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির মানচিত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কওমিপন্থীদের সম্পর্ক একটি দীর্ঘদিনের জটিল গল্প।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের একটি বক্তব্য সম্প্রতি রাজনীতির মাঠে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। নির্বাচনের আগেও তিনি ভোটারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত থাকলেই কোনো দল ‘হক’ হয়ে যায় না। কিন্তু এবার এক মাহফিলে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়াকে তিনি ‘গোমরাহি’ (পথভ্রষ্ট) বলেছেন।
মাওলানা আবদুল মালেক নিজে কওমি ধারার মানুষ, কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহর শিক্ষাসচিব। তাঁর কথায় তাই একজন আলেমের ব্যক্তিগত মত ছাড়িয়ে একটি ধারার দীর্ঘদিনের অস্বস্তির আভাস পাওয়া যায়।
যদিও জামায়াত নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূলের ক্ষোভ দেখা গেছে। তাঁরা প্রশ্ন রেখেছেন, সরকারি দলের লোকজনের দেশজুড়ে অন্যায় নিয়ে খতিব চুপ কেন? একটি ভিডিওতে জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজাকে বলতে শোনা গেছে, বড় মসজিদের ইমাম খেপে গেছেন।
জোটে থাকা এনসিপির ইসলামিক উইং ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের বেশির ভাগ সদস্য কওমিপড়ুয়া। তাঁদের মুখপাত্র বলেছেন, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
আঁচ লেগেছে মাওলানা মামুনুল হকের গায়েও। তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াতের জোটে আছে। অথচ তিনি কওমি ধারার সমাদৃত শাইখুল হাদিস আজিজুল হকের সন্তান, নিজেও শাইখুল হাদিস। পাল্টা জবাবে মামুনুল হক বলেছেন, মাওলানা আবদুল মালেক আলেম হিসেবে উঁচু দরের হলেও রাজনীতিতে তাঁর শিষ্যত্ব তিনি নেননি।
এর মধ্যে আগুনে ঘি পড়েছে হেফাজতে ইসলামের ‘ইসলামি ঐক্য’ উদ্যোগে। কওমি ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী এই সংগঠন সাতটি কওমি রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনতে চাইছে। সেখানে জামায়াত নেই সত্য, অথচ ওই সাত দলের দুটি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। কয়েক মাস ধরে চলা এ উদ্যোগ আটকে আছে একটা প্রশ্নে: এই ঐক্যের পরে জামায়াতের জোটে কোনো দল থাকতে পারবে কি না।
হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ বিবিসিকে বলেছেন, পারবে না। তিনি এ-ও স্পষ্ট করেছেন যে জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয়।
হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ভাষা আরও কঠিন। ২০২৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের একটি মাহফিলে তিনি জামায়াতকে ‘ধোঁকাবাজ ইসলামি দল’ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মানদণ্ডে ‘কাদিয়ানিদের চেয়েও খারাপ’ বলেছেন বলে গণমাধ্যমে এসেছে।
প্রতিক্রিয়ায় এই মন্তব্যকে ‘অসত্য, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ’ বলেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অতীতে জামায়াত এমন আক্রমণ সাধারণত এড়িয়ে যেত। বোঝা যায়, এবার সে নীতি ভেঙেছে।
প্রশ্ন ওঠে, ইসলামি রাজনীতির সবাই প্রায় একই লক্ষ্যের কথা বলেন, তবু কওমি আলেমদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে এত দূরের মনে করেন কেন?
উত্তরে বলা যায়, বিরোধের কারণ একটি নয়, তিনটি। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ‘আকিদা’র তর্ক আছে। ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়ার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, সেই প্রতিযোগিতা আছে। আর আছে ইতিহাসের জমে থাকা সন্দেহ।
তাহলে কেন আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কওমি আলেমরা কখনো জামায়াতের সঙ্গে বসেন, কখনো তাকে গোমরাহ বলে ঠেলে দেন। কারণ ‘বিশ্বাস’ বদলায় না, বদলায় রাজনীতির হিসাব।