কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও বাংলাদেশের সর্বজনীন শিক্ষা ভাবনা
সবাই জানি বুদ্ধিমত্তা দুই রকমের—জৈব ও কৃত্রিম। কিন্তু দিন পালটে আধিপত্যের স্থানে রদবদল হওয়ায় এখন কৃত্রিম ও জৈব বুদ্ধিমত্তা বলাই শ্রেয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত জৈব বুদ্ধিমত্তাই এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক। আরও লক্ষণীয়, ওই বুদ্ধিমত্তা কোনো দু-একজন মানুষের নয়, কোটি কোটি মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস ও অবদানের ফসল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই যে, মানুষের সৃষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আধিপত্য বিস্তার করতে বসেছে মানবিক জৈব বুদ্ধিমত্তার ওপর। আর তা ঘটছে গোষ্ঠী-আধিপত্য হিসেবে।
ভবিষ্যতে এই আধিপত্য কোথায় পৌঁছাবে, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলো বিশেষভাবে এমন একটি ভবিষ্যতের ছবি আঁকছে, যা এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কেউ কেউ বলছেন, এই আতঙ্ক ভিত্তিহীন। কিন্তু অনেকেই এখনও মনে করছেন এরূপ আতঙ্কজনক কিছু ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে; যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে মানবপ্রজাতির দাসত্ববরণ। তবে এর বাইরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অজস্র প্রশ্ন রয়েছে, যা আলোচনা হওয়া দরকার।
প্রথম প্রশ্ন হলো, আধিপত্যটা কার? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মালিকানা যে ধনিক গোষ্ঠীর হাতে, তাদের? উৎপাদন যন্ত্র ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তো সবচেয়ে বড় প্রশ্নই হলো মালিকানার প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি আরও জরুরি। আদতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রযুক্তির মালিকশ্রেণির কাছে মানবজাতির বিরাট অংশের স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই অশুভ আধিপত্যের আরও একটা ফল হচ্ছে জৈব বুদ্ধিমত্তার পশ্চাদপসরণ, অবহেলা ও অযত্নের শিকার হয়ে তার হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। জৈব বুদ্ধিমত্তা কিন্তু নিছক প্রযুক্তি নয়, দুঃখ-সুখের আবেগভরা সকল রহস্যের চূড়ায় জীবন্ত মানুষ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে কম্পিউটার যন্ত্র ডেস্কটপ থেকে ল্যাপটপ হয়ে এখন পামটপ বা মুঠোকম্পিউটারে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর একই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে নেকটপ কম্পিউটার বা প্রত্যেক মানুষের ঘাড়ের ওপর থাকা মস্তিষ্কটির প্রতি যারপরনাই অবহেলা। অথচ এই নেকটপ কম্পিউটার অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কই জগতের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষ বিশেষ কাজে মানুষের মস্তিষ্ককে ছাড়িয়ে গেলেও সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তায় তা এখনও একটি তেলাপোকার সমানও হতে পারেনি। হবে না যে তা বলা যায় না, বরং অচিরেই তা সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু কীভাবে? মানব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে উৎপন্ন হাইব্রিড বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। আবার সমান্তরালভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও শক্তি বাড়ছে ও বাড়বে। ভয়টা কিন্তু ওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নয়; ভয়টা হলো ওর মালিকানা কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বা সংস্থার বা রাষ্ট্রের হাতে, তাকে নিয়ে।
কিন্তু যে বুদ্ধিমত্তা এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক, যা এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী, নিরাপদ ও নৈতিক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন, ওই জৈব বুদ্ধিমত্তার প্রতি এত অবহেলা কেন? বিশেষ করে আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশগুলোয়। অর্থাৎ, দেশের যে শিশুকিশোররা স্কুল-কলেজে তাদের বুদ্ধিমত্তাকে বিকশিত করার সাধনায় নিয়োজিত, তাদের প্রতি মনোযোগের অভাব কেন? ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের মতো বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রগুলোকে যেরকম যত্ন করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা হয় ও সেগুলো কার্যকর রাখতে যে সেবা-শুশ্রূষা দেওয়া হয়, তার ছিটেফোঁটাও কি করা হয় দেশের শিশুকিশোরদের প্রতি? ভাবা হয় কি, কী করে তাদের বৌদ্ধিক সত্তার বিকাশ সাধন হবে?
কেউ কেউ অবশ্য পায়; সমস্ত যত্ন লাভ করে ওই শিশুকিশোররা, যাদের বাবা-মা অর্থবিত্তওয়ালা। কেবল তারাই পায় ভালো পুষ্টি, ভালো পরিবেশ, ভালো স্কুল ও ভালো শিক্ষক। তবে মানব কম্পিউটারের ক্ষমতায় বিস্ময়ের শেষ নেই। অভাবে, অপুষ্টিতে ও অযত্নে থেকেও তাদের অনেকে বৈষম্যের দেয়াল ডিঙিয়ে সাফল্যের চূড়ায় উঠে যায়। তার মানে এই নয় যে, উন্নত ইনপুট তাদের উন্নত আউটপুট দিতে সহায়তা করে না। অবশ্যই করে। যারা ‘মেধা, মেধা’ বলে সারাদিন গলা ফাটান, তারা জানেনই না যে, মেধা বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। সেজন্যই ভালো স্কুল, ভালো টিউটর, কোচিং, নোট-গাইড বই ইত্যাদি। কিন্তু মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রকৃত শিক্ষা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না; সাধনা করে শিখতে ও অর্জন করতে হয়। সমাজ ও শুভবুদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কহীন নিছক মেধার কদর করতে বৈষম্যমূলক সমাজ খুব যুতসই; শুদ্ধ নিরপেক্ষ মেধা তারই প্রয়োজন।
আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা এই মেধার গৌরব প্রচারে মত্ত। এই মেধা শিশুর মানবিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এ হলো মেধা নামক এক পেশিশক্তির চর্চা ও উন্নতি। আমাদের সব শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাকর্মকর্তা সবসময় এই মেধা খুঁজে বেড়ান। এজন্যই আমাদের অনেকের শিশুকিশোরদের প্রতি নির্দয় ভাষা ব্যবহার করতে দেখি। যখন শিক্ষাব্যবস্থাটা তৈরি করা হয়েছে মেধাপেশি তৈরির জন্য, তখন তা নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্মকর্তারা কোনো না কোনো পেশি বা নিদেনপক্ষে জিহ্বাশক্তি ব্যবহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পুলিশ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাকর্মকর্তা মুখোমুখি দাঁড়াবেন মল্লযুদ্ধে—এই যেন স্বাভাবিক। এই মাঠে কাকে কার চেয়ে কম মেধাবী, মেধাপেশিশক্তিতে কে কার চেয়ে কম বলীয়ান বলা যায়? পুরো বাংলাদেশটাই তো মেধাবীদের দখলে। দেশে ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে মেধা খুঁজে বের করায়, মেধাবীদের আলাদা করায়, মেধার কারিশমা চিহ্নিত করায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ফিফার মতোই অনমনীয়, আপসহীন।