রূপালি পর্দা থেকে একাত্তরের অগ্নিপথ: কবরীর ‘স্মৃতিটুকু থাক’

বিডি নিউজ ২৪ বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:২৬

জনপ্রিয়তা আর রূপালি পর্দার আলোকবৃত্তে যার পরিচয় ‘মিষ্টি মেয়ে’, পর্দার বাইরে সেই কবরীর জীবনের প্রতিটি বাঁক যেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক-একটি সংগ্রামের পর্ব। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক আইকন, ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের এক অকুতোভয় সাক্ষী ও একাত্তরের নির্ভীক কণ্ঠস্বর। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারের 'মিনা পাল' থেকে কিশোর বয়সে চলচ্চিত্রের 'মিষ্টি মেয়ে' কবরী হয়ে ওঠার গল্পটা মৃত্যু পর্যন্ত রোমাঞ্চকর।


এই গল্পটা তিনি তার 'স্মৃতিটুকু থাক' আত্মকথনমূলক বইয়ে অনবদ্য ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছেন; আলমগীর কুমকুম পরিচালিত এবং তারই অভিনীত ‘স্মৃতিটুকু থাক’ চলচ্চিত্রের নামানুসারে বইটির নামকরণ করা হয়েছে। বইটির ভূমিকা অংশে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হলো, আমি কোনো কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য পাঠ করছি’। বইটির প্রকাশনা সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড (বিপিএল); এর প্রকাশক লিখেছেন, ‘শিল্পের আর জীবনের দায় যখন এক বিন্দুতে জ্বলে, সেই দায়ের কাছে সংসার-জগৎ তুচ্ছ হয়ে যায়, সাহস তখন মানুষকে পথ দেখায়। পথ দেখিয়েছে কবরীকেও’।


রাজনৈতিক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ


ছোটবেলা থেকেই তার পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতির উত্তাপ ছিল। তার বাবা নিয়মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভা-সমাবেশে অংশ নিতেন। একবার তো ভিড়ের চাপে পাঞ্জাবি ছিঁড়ে, জুতা হারিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল তাকে। এমন এক রাজনৈতিক আবহেই বেড়ে ওঠা কবরীর রক্তে মিশে ছিল বায়ান্ন থেকে একাত্তরের উত্তাল চেতনার বীজ।


তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগেই ‘সুতরাং’, ‘বাহানা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন জননন্দিত একজন নায়িকা। তখন তিনি থাকতেন ঢাকার ইস্কাটনের একটা ভাড়া বাসায়। মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে শুভাঙ্ক্ষীদের পীড়াপীড়িতে তিনি নতুন কেনা টয়োটা গাড়ি আর মাইক্রোবাস নিয়ে চলে এলেন চট্টগ্রাম শহরে মা-বাবার কাছে। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা; সবার মধ্যেই আতঙ্ক। এরপর কয়েকটা বাসা বদল করে তিনি উঠলেন আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবুর ছোট বোন পুটি আপার সেনানিবাসস্থ বাসভবনে। কিছুদিন পর সেখানেও গোলাগুলি শুরু হলো।


একদিন ভোরে রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন, চারিদিকে ট্রেঞ্চ, রাস্তা কেটে ব্যারিকেড। সেখানে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে দেখা হলে, তারা বলল, ‘আপা, একটা গাড়ি আমাদের দিন, রসদ আনতে হবে। তেলের কোটা করে দিয়েছে—গাড়িটা আমাদের দিলে যুদ্ধে কাজে লাগবে’। কবরী তার মাইক্রোবাসটা সেই মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দিলেন।


পরবর্তীতে তিনি টয়োটা গাড়ি নিয়ে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলে এলেন চট্টগ্রামেই নিজেদের গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু এখানকার অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে ছিল রাজাকারদের উৎপাত। কবরী গ্রামে এসেছে একথা রটে যাওয়ায় নিরীহ গ্রামবাসীও ভয় পেতে শুরু করে; তাই তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে যান—এটাই অনেকের চাওয়া ছিল। ১৯ এপ্রিল রাতে দুই শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ৮/১০ জনের একটি কাফেলায় পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঘুটগুটে অন্ধকারে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তারা নারায়ণহাটে এসে উপস্থিত হন; জায়গাটা তখনও ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। সেখানে বাঙালি এক ক্যাপ্টেন, নাম কাদের, তিনি তাকে চিনে ফেলেন। ক্যাপ্টেন কাদের জিপে করে তাদের পৌঁছে দেন সীমান্তে। কবরী লিখছেন, ‘ধূলা উড়িয়ে চলে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন কাদেরের গাড়ি। বুকের ভিতর হু হু করে ওঠে অজানা ভয়’। তার এই ভয় অমূলক ছিল না। পরদিন সকালেই তিনি খবর পান, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাপ্টেন কাদেরসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে মেরে ফেলেছে।


খবরটি শোনার পর কবরীর আর্তনাদ ছিল একাত্তরের সেই সকল লাখো শহীদের প্রতি এক সম্মিলিত শোকধ্বনি, যাদের একজন নিজের জীবন দিয়ে এক বিপন্ন নারীর পথ নিরাপদ করেছিলেন।


শরণার্থী জীবন


এভাবেই আরও অগণিত শরণার্থীর সঙ্গে শুরু হয় কবরীর শরণার্থী জীবন। বাসে করে আগরতলা এসে উঠলেন এক সস্তার হোটেলে। সম্বল সামান্য কিছু কাপড় আর টাকা। দুই বাচ্চাকে নিয়ে ওই হোটেলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন; এমনকি গোসলের পানির অভাবও ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক অনিল ভট্টাচার্য তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন; যদিও সেখানেও অনেক শরণার্থীর ভিড় ছিল। তার কাছেই হয় কবরীর বক্তৃতা দেওয়ার হাতেখড়ি। এরপর পাড়ায় পাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা করতে করতে তার মুখের জড়তা কাটতে থাকে।


একসময় তিনি চলে এলেন কলকাতায়, দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ডা. দে-র বোনের বাড়িতে। তাদের ছেলে ডাক্তার দীপঙ্কর পরবর্তীতে অভিনয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তারা খালেদ মোশাররফসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করতেন। ওই বাড়িতে এসে মানসবাবু, যিনি নিজে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় সর্বস্ব হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তিনি নিজের অভাবের মধ্যেও কবরীকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এই মমত্ববোধ কবরীকে শিখিয়েছিল যে, যুদ্ধ কেবল সীমানায় নয়, যুদ্ধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের ভেতরেও।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও