এআই চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি নতুন সুযোগ তৈরি করবে?
প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিবারই নতুন কোনো আবিষ্কার মানুষের মনে একই প্রশ্ন জাগিয়েছে—এবার কি মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? আঠারো শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় যন্ত্রচালিত তাঁত দেখে ব্রিটেনের বহু শ্রমিক আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁদের জীবিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীতে কম্পিউটার অফিসে প্রবেশের সময়ও বলা হয়েছিল, অসংখ্য চাকরি বিলুপ্ত হবে।
ইন্টারনেটের প্রসারের সময় একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি কখনো শুধু চাকরি ধ্বংস করেনি; বরং শ্রমবাজারের চরিত্র বদলে দিয়ে নতুন অর্থনীতি ও নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়।
তবে এআই ঘিরে বর্তমান উদ্বেগ আগের যে কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চেয়ে গভীর। কারণ এটি শুধু শারীরিক শ্রম নয়, মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ, লেখা, নকশা, অনুবাদ, প্রোগ্রামিং, এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু অংশও সম্পন্ন করতে সক্ষম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এআই কি কোটি কোটি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে? বাস্তবতা হলো, দুটি সম্ভাবনাই একসঙ্গে সত্য।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে প্রায় ৯২ মিলিয়ন বিদ্যমান চাকরি বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে নতুন করে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ নিট হিসাবে প্রায় ৭৮ মিলিয়ন নতুন চাকরি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অর্থ, সমস্যা চাকরি হারানো নয়; বরং নতুন ধরনের কাজের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করতে না পারা।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। উন্নত অর্থনীতিতে এই হার আরও বেশি। তবে IMF-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—এআই অনেক চাকরিকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে, তারা আগের চেয়ে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসির গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, আগামী দশকে কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশকে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মবাজারে একই পেশার ভেতরেও কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাবে।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশকেও সরাসরি স্পর্শ করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন তাদের দক্ষতা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্যথায় একই জনসংখ্যা বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে।