এবিএম আব্দুল্লাহর হেনস্তা ও মেধা অবমাননার আত্মঘাতী রাজনীতি

বিডি নিউজ ২৪ ফজিলাতুন নেসা শাপলা প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২৬, ১১:০২

দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, এমনটা বলে বলে যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হলো এবং যে বয়ানের অনিবার্য পরিণতিতে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে সত্যিই একটা পরিবর্তনও ঘটল, সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আলো দেখতে পাচ্ছি আমরা? উত্তরটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে পরমতসহিষ্ণুতার যে চরম আকাল দেখা দিয়েছিল, তা নির্বাচিত সরকারের আমলেও উদ্বেগজনকভাবে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এই অন্ধ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সমাজের গুণী ও কৃতী ব্যক্তিরা–যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো এমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর ওপর নেমে আসা হেনস্তা।


ক্ষমতার এই নির্মম খেলা কতটা আত্মঘাতী হতে পারে, তা এবিএম আব্দুল্লাহর জীবন ও সাধনার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন তার সমসাময়িকরা তো বটেই, তারই ছাত্ররা হাজার বা দুই হাজার টাকা ভিজিট নিচ্ছেন, তখনও তিনি দিনের পর দিন মাত্র ৩০০ টাকা ফিতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। যদিও তার সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় এই কম ফিতে রোগী দেখার বিষয়টি খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ মাত্র, কিন্তু এটি প্রমাণ করে মানুষের প্রতি তার নৈতিক দায়বদ্ধতা কতটা গভীর। ক্ষমতার পালাবদলে যখন এমন একজন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও গবেষককে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জাঁতাকলে ফেলে সম্মাননা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন তা আর সাধারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের ঘটনা থাকে না।


গত বুধবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এবিএম আব্দুল্লাহর ‘অধ্যাপক এমিরেটাস (আজীবন)’ নিয়োগটি ‘বিধি বহির্ভূত’ অজুহাতে বাতিল করেছে। শুধু তা-ই নয়, চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া তার সমস্ত বেতন এবং ভাতাদিও ফেরত চাওয়া হয়েছে। ১৯৯৫ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে পরবর্তী সময়ে মেডিসিন বিভাগের ডিনের দায়িত্ব পালন করা এই প্রথিতযশা চিকিৎসক ২০১৯ সাল থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন। ঘটনা আসলে এখানটাতেই। এবিএম আব্দুল্লাহও তা জানেন।


স্বভাবতই এবিএম আব্দুল্লাহ ব্যথিত বোধ করবেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি একে সরাসরি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “এটা আজীবনই হয়, তারা এমন করতে পারে না। তারা বেতন ফেরত চেয়ে সবচেয়ে নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।” একটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচের অজুহাতে একজন অধ্যাপকের সম্মাননা কেড়ে নেয় এবং অর্থ ফেরত চেয়ে হেনস্তা করে, তখন আর বুঝতে অসুবিধে থাকে না, তা যতটা আইনগত তারও বেশি রাজনৈতিক। এ সিদ্ধান্ত আরও স্পষ্ট করে দেয় যে এ দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে নামেই স্বায়ত্তশাসিত, আসলে দলীয় আনুগত্যই এগুলোর বড় চালিকাশক্তি।


আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের যখন এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তার কষ্টার্জিত পদ-পদবি কেড়ে নেওয়া হয় এবং শুধু পদ-পদবি কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত না হয়ে তার প্রাপ্ত অর্থ ও সম্মাননা ফেরত চেয়ে হেনস্তা করা হয়, তখন তা আর কেবল রাজনীতির খেলা থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি গোটা সামষ্টিক কাঠামোর আত্মহত্যার শামিল। এই ধরনের ঘৃণ্য প্রতিহিংসামূলক আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং সমাজমানসে যে মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা উসকে দিচ্ছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে।


অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে যে ডিপ স্টেটের ভয়ঙ্কর খেলা বলে অভিহিত করে কেউ কেউ, তা নিছক কথার কথা নয়। পুরোনো অচলায়তন এবং সমাজে অনিষ্টকারী প্রথা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার মতো নতুন নেতা, নতুন নেতৃত্ব নেই। সবাই তো শুধু নিজস্ব হিসাব-নিকাশ মেলাতেই ব্যস্ত। আজকের বাংলাদেশকে এত দূর এগিয়ে আনবার জন্য বিশেষ কিছু মানুষের জ্ঞান, শ্রম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা গত ৫৩ বছরে নিশ্চয়ই ছিল। এবিএম আব্দুল্লাহ সেরকমই একজন গুণী চিকিৎসক ও সাধক। যখন সেই সাধনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রং লাগিয়ে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা করা হয়, তখন একই সঙ্গে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ভাবনা নতুন করে ভাবি কীভাবে?


এই ঘটনাটা তরুণ ও উদীয়মান প্রজন্মের সামনে কী উদাহরণ রাখবে? ওরা দেখছে যে, দেশের জন্য আজীবন নিবেদিতপ্রাণ একজন গুণী মানুষকে সামান্য রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ক্ষমতার পালাবদলের পর চরমভাবে অপমানিত হতে হচ্ছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে ওরা দেশপ্রেম শিখছে, নাকি ওরা দেশের প্রতি আরও বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে? সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কিছু করার যে স্বাভাবিক দেশপ্রেম ও তাড়না, তা কি ওদের ভেতর থেকে মরে যাবে না?


গত বিশ বছরের চিত্র যদি দেখি, তাহলে দেখব সামর্থ্যবান অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে ব্যস্ত। যে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা আর্থিকভাবে সামর্থ্য নন, কিন্তু নিজেদের মেধার জোর আছে, তারাও বৃত্তি নিয়ে দলে দলে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। দেশটা বহু দিন ধরেই মেধাশূন্য হতে শুরু করেছে। এখন এ ধরনের ঘটনাগুলো শুধু ব্রেইন-ড্রেইনের পালকে নতুন মাত্রা যোগ করবে। চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের মেধাবীরা স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পথ খুঁজছে। মেধার এই শূন্যতা কি বিত্তবৈভব আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব? যে রাষ্ট্র তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিরাপত্তা ও সম্মান দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে একটি বুদ্ধিহীন, অদক্ষ ও পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হতে বাধ্য।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও