পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার: পৃথিবী বাঁচানোর শেষ সতর্কসংকেত
ঢাকার এক শিশু সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলতেই নির্মল বাতাস নয়, ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ পায়। স্কুলে যাওয়ার পথে তার কানে বাজতে থাকে অবিরাম হর্নের শব্দ। রাস্তার পাশে জমে থাকা প্লাস্টিকের স্তূপ, কালো পানির খাল আর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ—এটাই যেন তার স্বাভাবিক পৃথিবী। অথচ পৃথিবী এমন হওয়ার কথা ছিল না। প্রকৃতি মানুষের আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল, মানুষের আক্রমণের শিকার নয়।
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৪ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং সরকার, প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করা। আজ অর্ধশতাব্দী পরে এসে দিবসটির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছে। কারণ, পরিবেশ সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা।
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য—‘প্রকৃতি দ্বারা অনুপ্রাণিত: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিকেই প্রধান সহায় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান। বন, নদী, জলাভূমি, সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা সম্ভব নয়—এই উপলব্ধিকেই এবারের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না; বরং প্রকৃতিনির্ভর পরিকল্পনাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবী গঠনের অন্যতম শর্ত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ, আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব মানুষের প্রতিদিনের জীবনে সরাসরি আঘাত হানছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদীদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক নীরব আর্তনাদ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকটগুলোর একটি হলো বায়ুদূষণ। বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার নাম প্রায়ই শীর্ষের দিকে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর বাতাস যেন ধুলোর চাদরে ঢেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বায়ুদূষণ মানুষের ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শিশুদের শ্বাসকষ্ট, বয়স্কদের হৃদ্রোগ এবং নানা জটিল রোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।
এই দূষণের প্রধান উৎস ইটভাটা, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং শিল্পকারখানার নির্গমন। রাজধানীর চারপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা কেবল বাতাসই দূষিত করছে না; কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস করছে। উন্নয়নের নামে নির্মাণযজ্ঞ চললেও পরিবেশগত মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
শব্দদূষণও এখন এক নীরব মহামারি। ঢাকার সড়কে অবিরাম হর্ন, উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার, নির্মাণকাজের শব্দ—এসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ অনিদ্রা, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি শ্রবণক্ষমতা হ্রাসের কারণ হতে পারে। অথচ এই দূষণকে আমরা প্রায়ই “স্বাভাবিক নগরজীবন” বলে মেনে নিই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব পরিবেশ দিবস