মা মরে পড়ে থাকেন, সমাজ বেঁচে থাকে কীভাবে?
রাজধানীর একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট। দরজার ওপাশে নিস্তব্ধতা। দিনের পর দিন কেউ আসেনি, কেউ কড়া নাড়েনি। প্রতিবেশীরা হয়তো ভেবেছেন, বৃদ্ধা মহিলা কোথাও গেছেন কিংবা অসুস্থ হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও ভয়াবহ।
সেই ফ্ল্যাটে একা পড়ে ছিলেন একজন মা। তিনি আর বেঁচে ছিলেন না। মৃত্যুর পর কেটে গেছে প্রায় এক সপ্তাহ। নিথর দেহ পচতে শুরু করেছে। পোকা-মাকড় মরদেহ খেয়ে ফেলছে ধীরে ধীরে। জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে ছিল না কোনো সন্তান, কোনো স্বজন, কোনো পরিচিত মুখ। ছিল শুধু নীরবতা, নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর নির্মম অপেক্ষা।
পরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে মরদেহ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওই মায়ের সন্তানরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। কেউ বিদেশে, কেউ দেশে ভালো অবস্থানে আছেন। কিন্তু যে নারী তাদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন, নিজের জীবন, সময়, স্বপ্ন আর যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই মানুষটির মৃত্যুর খবর জানার মতোও কেউ পাশে ছিলেন না।
এ ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের সময়ের, আমাদের সমাজের, আমাদের বিবেকের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন জাগে—আমরা এতটা অমানবিক হলাম কবে থেকে?
মানুষ সভ্য হয়েছে হাজার হাজার বছরের বিবর্তনে। প্রযুক্তি, শিক্ষা, অর্থনীতি, নগরায়ণ—সবকিছুতেই আমরা এগিয়েছি। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কি কেবল তার উন্নত প্রযুক্তি, নাকি তার মানবিকতা? যদি মানবিকতাই সভ্যতার মাপকাঠি হয়, তবে এমন মৃত্যুর সংবাদ আমাদের উন্নয়নের অহংকারকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাংলা সংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য আবেগ, ত্যাগ ও ভালোবাসার ইতিহাস। সন্তান অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকা, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া, নিজের ক্ষুধা ভুলে সন্তানকে খাওয়ানো—এসব গল্প কোনো সাহিত্যিক কল্পনা নয়; আমাদের সমাজের প্রতিদিনের বাস্তবতা। অথচ সেই মা যখন বৃদ্ধ হন, দুর্বল হন, নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তিনি হয়ে ওঠেন অবাঞ্ছিত এক দায়।
বিশ্বজুড়ে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। বাংলাদেশও দ্রুত সেই বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু প্রবীণবান্ধব সামাজিক কাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা এবং পারিবারিক নিরাপত্তা একই হারে গড়ে উঠছে না।
একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। একই ছাদের নিচে দাদা-দাদি, বাবা-মা, সন্তান সবাই একসঙ্গে বাস করত। প্রবীণদের জন্য ছিল স্বাভাবিক নিরাপত্তা বলয়। আধুনিক নগরজীবন সেই কাঠামোকে দ্রুত ভেঙে দিয়েছে। চাকরি, শিক্ষা, অভিবাসন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের কারণে পরিবার ছোট হয়েছে, দূরত্ব বেড়েছে। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব কখনোই হৃদয়ের দূরত্ব হওয়ার কথা ছিল না।
আজকের সমাজে একটি নতুন সংকট তৈরি হয়েছে—‘সামাজিক নিঃসঙ্গতা’। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ধূমপান বা স্থূলতার মতোই ক্ষতিকর হতে পারে। প্রবীণদের মধ্যে একাকিত্ব বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ, হৃদরোগ এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে এ সমস্যাকে এখন জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মরদেহ উদ্ধার
- অযত্ন- অবহেলায়