বর্তমান বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান কেন জরুরি
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অনন্য-অনবদ্য অধ্যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কাজ করেছেন।
তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণাটি একটি সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন আদর্শ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি শক্তিশালী দর্শন।
বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গণমানুষের আস্থার সংকট, সর্বত্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বিভাজন, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দেশের সামনে নতুন করে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে পুনর্বিবেচনা করে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে যে কয়জন রাষ্ট্রনায়কের চিন্তা ও কর্মধারা নতুন করে আলোচনায় আসে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তিনি ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী সংকটকালে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একজন বাস্তববাদী রাজনৈতিক চিন্তক, যিনি বিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং জনগণকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাদ্যসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি মৌলিক দর্শন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন—রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং উন্নয়নের মূলশক্তি জনগণের অংশগ্রহণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না, বরং গ্রাম, কৃষক, শ্রমিক, যুবক, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করেই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
বর্তমান বাংলাদেশেও সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিভিন্ন মতাদর্শের নাগরিক ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের জনগণ কতটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারছে—এই প্রশ্ন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অন্তর্ভুক্তি রাজনীতির চর্চা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের শত্রু নয়, বরং তা গণতন্ত্রের শক্তি। সেই কারণে তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেন।
আজ যখন জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও জিয়াউর রহমানের চিন্তা নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি উন্নয়নকে শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। আজ যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন, তখন উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও স্বনির্ভরতার প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী আজ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও হতাশাও রয়েছে। জিয়াউর রহমান তরুণদের রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে দেখতেন। তিনি যুবশক্তিকে উৎপাদন, নেতৃত্ব ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা খুব জরুরি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তববাদিতা ছিল জিয়াউর রহমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি কিংবা প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যেখানে ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, সেখানে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বাস্তববাদী কূটনীতি আগের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের একটি বড় দিক হলো আস্থার সংকট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, জনগণ, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে, এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আস্থার ঘাটতি দৃশ্যমান। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রকে টেকসই করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র শুধু আইন বা প্রশাসনিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণই তার প্রকৃত ভিত্তি।
জিয়াউর রহমান যে ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন, তা ছিল এক যুগান্তকারী উদ্যোগ—একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নির্মাণের রূপরেখা। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন, কৃষকের জন্য সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করেন এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেন। তাঁর পদক্ষেপে শুধু উন্নয়নই নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া দর্শন এবং ১৯ দফা কর্মসূচি আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় এক সৃজনশীল ও সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে গঠনমূলক অবদান রেখেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং জনগণের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের ডাক দেন, যার মধ্যে ১২টি মৌলিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল; যেমন—কৃষি সংস্কার, শিক্ষা সংস্কার, সমাজ সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, শ্রম আইন সংস্কার, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহতকরণ এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।
তিনি কৃষি উন্নয়ন এবং কৃষকের অবস্থা উন্নত করার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। দেশের গ্রামে গ্রামে গিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর পরিশ্রমে তিনি ‘সবুজ বিপ্লব’ বা কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কৃষি গবেষণায় অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। খাল খনন কর্মসূচি তাঁর অন্যতম প্রধান উদ্যোগ ছিল, যা সেচ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে সাহায্য করে। একইভাবে বৃক্ষরোপণ, মাছ চাষ ও গবাদি পশু পালনের উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন এবং পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। জাতীয় বীজ অধ্যাদেশের মাধ্যমে তিনি কৃষকের কাছে ভালো বীজ পৌঁছে দিতে এবং কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ধর্মকে ভিত্তি করে হতে পারে না। ধর্মের একটি অবদান থাকতে পারে রাজনীতিতে, তবে ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল গঠন করা উচিত নয়, কারণ অতীতে এমন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আধুনিক ও সৃষ্টিশীল চিন্তাধারার সঙ্গে গণমুখী এবং কল্যাণকর রাজনীতি গড়ে তোলা উচিত।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক জীবন
- জিয়াউর রহমান