মায়ের মৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন
গত সপ্তাহের শনিবার আমার নিয়মিত কলামটি আমি লিখতে পারিনি। কারণ, আমার মা গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। এটা অবশ্য কথার কথা। ৯৫ বছর বয়সেও তিনি আসলে এ পৃথিবী থেকে যেতে চাননি। প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর মধ্যে বাঁচার আকুতি দেখা যেত। তিনি জন্মেছিলেন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে। বাল্যকালেই দেখেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। যদিও পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে যুদ্ধের ঢেউ এসে লাগেনি। তবে তাঁর জন্মের আগে থেকেই একটা ছোট্ট ঢেউ এসে সারা বাংলাকে জাগিয়ে তুলেছিল। তাই মায়ের নাম দেওয়া হয়েছিল রোকেয়া। বেগম রোকেয়া তখন সারা বাংলায় মুসলিম পরিবারে একটি বহুল উচ্চারিত নাম। শিক্ষার আলো তখন মুসলিম পরিবারে ঢুকে পড়েছে। তাঁরই আত্মীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে প্রথম এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
আমার মায়ের বাল্যকালে এসব সুসংবাদের পাশাপাশি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি দুর্ভিক্ষে পূর্ব বাংলা আক্রান্ত হয়েছে। দাঙ্গার সহিংসতা গ্রামাঞ্চলে দেখা না গেলেও হিন্দুদের দেশত্যাগ তাঁকে ব্যথিত করেছিল। এর মধ্যেই খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আমার বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার। তাই ‘বেগম’ পত্রিকা পড়ার সুযোগটাও ঘটেছিল। তাঁর ফুফুরা সংগীত অনুরাগী ছিলেন। তাই ফুফুদের পাশেই গান শুনতে শুনতে এবং গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে দু-চারটে গান শিখেও ছিলেন। তার মধ্যে ছিল ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ অথবা ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো’। শিশুকালে আধো ঘুমে এবং জাগরণে তাঁর কণ্ঠে কখনো কখনো গান শুনেছি। সুন্দর চিঠি লিখতে শিখেছিলেন। গোটা গোটা বর্ণমালায়। এর মধ্যে দেশভাগ এবং মনে পড়ে তাঁর কোলে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতেই প্রথম স্লোগান শুনেছিলাম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ভাষা আন্দোলনের পরিধি তখন গ্রামবাংলায় গিয়ে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, মওলানা ভাসানীর উদাত্ত কণ্ঠ, প্লাবন, দুর্ভিক্ষ, সামরিক শাসন এবং নানা আন্দোলনের পথ পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধ।