নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদ যাত্রা নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
পবিত্র ঈদুল ফিতর মানেই শেকড়ের টানে এক বিশাল জনস্রোত। যান্ত্রিক নগরীর কর্মব্যস্ততা ফেলে প্রতিটি মানুষ তখন চায় মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন আর শৈশবের স্মৃতিঘেরা আঙিনায় ফিরে যেতে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ‘ঘরে ফেরা’ কেবল একটি যাত্রা নয়, বরং এটি এক পাক্ষিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে গত কয়েক দশকের ট্র্যাজেডি হলো—এই উৎসবের আনন্দযাত্রাই অনেকের জন্য পরিণত হয় জীবনের শেষ যাত্রায়। সংবাদপত্রের পাতায় ঈদ যাত্রার বর্ণনায় ‘ভোগান্তি’ আর ‘দুর্ঘটনা’ শব্দ দুটি যেন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-এর এই পরিবর্তিত ও সংস্কারমুখী বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—জনগণের এই আবেগঘন যাত্রাকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও মর্যাদাপূর্ণ করা।
বিগত আওয়ামী শাসনামলে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে দুর্নীতির পাহাড় গড়ে উঠেছিল। বড় বড় মেগা প্রজেক্টের গল্প শোনানো হলেও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের নিরাপত্তা ছিল চরমভাবে উপেক্ষিত। গণমাধ্যমের গত ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো মানুষ। এই মৃত্যুর মিছিলের প্রধান কারণ ছিল পরিবহন সেক্টরে ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট সিন্ডিকেট।
তৎকালীন সময়ে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িকে মহাসড়কে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতো। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে চালকদের লাইসেন্স ও দক্ষতার তোয়াক্কা করা হতো না। ফলে ঈদ যাত্রা মানেই ছিল এক অনিশ্চিত গন্তব্য। ট্রেনের টিকিটের কালোবাজারি থেকে শুরু করে বাসের টিকিটে কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়া আদায়—সবই চলত প্রশাসনের নাকের ডগায়। বিগত বছরের সম্পাদকীয়গুলোতে উঠে এসেছিল কীভাবে সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা—পরিবহন মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্নীতির কারণে সড়কগুলো এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল।
বর্তমান সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন, তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ট্রাফিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেভাবে ভিভিআইপি কালচার পরিহার করে সাধারণ ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এর আগে আমরা দেখেছি, একজন ভিভিআইপি-র চলাচলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে হাজার হাজার মানুষকে জ্যামে আটকে রাখা হতো।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ‘রাজকীয়’ প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি লালবাতি জ্বালিয়ে বা রাস্তা ব্লক করে চলাচলের ঘোর বিরোধী। তিনি নিজে সড়ক আইন মেনে চলছেন, যা পুরো পুলিশ বাহিনী এবং প্রশাসনের জন্য এক নীরব অথচ শক্তিশালী বার্তা। তাঁর এই সময়ানুবর্তিতা এবং ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়’—এই নীতি যদি এবারের ঈদ যাত্রায় প্রতিটি মহাসড়কে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বারবার নির্দেশনা দিচ্ছেন যে, রাস্তার শৃঙ্খলা কেবল চালকদের ওপর নির্ভর করে না, বরং প্রশাসনের কঠোর তদারকি এবং আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। তাঁর এই সদিচ্ছাই এবারের ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করার প্রধান চালিকাশক্তি।