বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ভিত্তি নির্মাণ এবং স্বতন্ত্র গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিংবা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতিও ছিল একটি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ।
পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অর্থপূর্ণ সহায়তা অর্জন, মুসলিম বিশ্ব ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা, আঞ্চলিক ইস্যুতে দৃঢ়তার সঙ্গে সার্বভৌম স্বার্থ প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক পরিচয় নির্মাণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে তখন উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আদর্শিক আনুগত্য বা আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত বাস্তবতাভিত্তিক, যেখানে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করা।
এ পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান একদিকে নিরপেক্ষতা ও নির্জোট নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পথ অনুসরণ করেন।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ছিল আদর্শিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও জোরদারের উদ্যোগ নেন, ফলে একদিকে যেমন উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহায়তার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়; অপর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি সংকীর্ণ ও সীমিত পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমশ বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বার্থকেন্দ্রিক রূপ লাভ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশ নিজেকে কেবল সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ, বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছিল এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফলে বিদেশি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
একই সঙ্গে এই উদ্যোগ দেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে। আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস হিসেবে প্রবাসী আয় যে ভূমিকা রাখছে, তার ভিত্তি এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।