পুলিশের সামনে চোখ নামিয়ে কথা বলতে হবে কেন?
নামের বিভ্রাটের কারণে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বেনাপোল প্রতিনিধি মোহা. আসাদুজ্জামানকে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর চার দিনের মাথায় চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পিটিয়ে আবারও বিতর্কের জন্ম দিল পুলিশ।
শুধু তাই নয়, সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, নাঈমকে চট্টগ্রামের খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান ‘চোখ নামিয়ে কথা বল’ বলে হম্বিতম্বি করেছেন সেই রাতে। প্রশ্ন হলো, পুলিশের সামনে নাগরিকদের চোখ নামিয়ে কথা বলতে হবে কেন, যে নাগরিকের করের পয়সায় পুলিশের বেতন হয়? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তর সমালোচনার মুখে ওই ওসি এবং আরও দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার শিকার যদি জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার না হয়ে সাধারণ কোনো নাগরিক হতেন, তাহলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে এরকম ব্যবস্থা নেওয়া হতো কিনা, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
ঘটনার যে বিবরণ সংবাদমাধ্যমে এসেছে সেটি এরকম: ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেওয়ার পর গত ১২ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রামের বিমানবন্দর থেকে সিএনজি করে বাড়ি ফিরছিলেন নাঈম হাসান। লালখানবাজার ফ্লাইওভার এলাকায় তার বাহন থামিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। নাঈমের বিবরণ অনুযায়ী, একজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি এবং দুজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করতে শুরু করে। নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে জানানোর পরেও আক্রমণ থামানো হয়নি।
নাঈম বলেন, ‘পুলিশ ফ্লাইওভারের নিচে আমার সিএনজি দাঁড় করাল, ড্রাইভারের থেকে কাগজপত্র নিল। আমি পুলিশকে বললাম, আপনি আমার ব্যাগ চেক করেন দরকার হলে।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাঈম জানান, তাকে গলা চেপে ধরে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রতিরোধ করে বের হয়ে আসার পরও নির্যাতন অব্যাহত থাকে। পাঞ্জাবি পরা একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের কোনো পরিচয় দেননি, তিনি পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রায় এক থেকে দেড়শো লোক নাঈমের পরিচয় নিশ্চিত করা সত্ত্বেও মারধর বন্ধ হয়নি।
মারধরের একপর্যায়ে তাকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয়। ওসির কক্ষেও তাকে হেনস্তা করা হয়েছে। ওসিকে তিনি যখন ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন, তখন ওসি বারবার বলেন, ‘চোখ নামিয়ে কথা বল’। এর মধ্যেই একটি ফোন পেয়ে ওসি শান্ত হন।
ওসিকে কে ফোন করেছিলেন তা এরই মধ্যে দেশবাসী জেনে গেছে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি জাতীয় দলের ক্রিকেটার না হলে এবং আরেকজন তারকা ক্রিকেটার, যিনি বর্তমানে বিসিবির সভাপতি, সেই তামিম ইকবাল ফোন না করলে অবশ্যম্ভাবীভাবে নাঈমের সবচেয়ে সহজ পরিণতি হতো এই যে, তাকে সারা রাত থানা হাজতে রাখা হতো; পরের দিন সকালে আদালতে চালান করে দেওয়া হতো। তারপর আইনজীবীর মাধ্যমে তার হয় জামিন হতো, অথবা হতো না। দ্বিতীয় বিকল্প হলো, আদালতে পাঠানোর আগেই মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিত। প্রতিনিয়ত দেশের নাগরিকদের সঙ্গে নাগরিকের ট্যাক্সের পয়সায় বেতন নেওয়া পুলিশ সদস্যদের আচরণ কমবেশি এরকমই।
নাঈম প্রশ্ন তুলেছেন, জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলে তিনি রক্ষা পেয়েছেন। অন্য কারো বেলায় এই ঘটনা ঘটলে তার পরিণতি কী হতো? এই প্রশ্নটা শুধু নাঈমের নয়, দেশের কোটি মানুষের।
কয়েকটি প্রশ্নের মীমাংসা করা দরকার।
১. ধরা যাক পুলিশ নির্দিষ্ট কোনো সংবাদ বা অভিযোগের ভিত্তিতেই নাঈম হাসানের গাড়ি আটকাল। কিন্তু পরিচয় পাওয়ার পরেও কেন তাকে লোকজনের সামনেই বেদম মারধর করল? কেন এত ক্ষোভ বা উৎসাহ?
২. যদি নির্দিষ্ট মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে হয়, তাহলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখাতে হয়। নাঈমকে পুলিশ কোনো কাগজ দেখায়নি।
৩. বলা হচ্ছে, একটা চোরাচালান সংক্রান্ত কিছু পণ্যের তথ্য ছিল; সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গিয়েছে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় পুলিশ এই অভিযান চালাল এবং আইনের কোন ধারাবলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রাস্তার ওপরে প্রকাশ্যে পেটাল—সেই প্রশ্নের সুরাহা করা প্রয়োজন।
৪. সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারায় আটক করার ক্ষমতা পুলিশের আছে। কিন্তু সেই সন্দেহটাও যৌক্তিক হতে হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় কাউকে আটক করতে হলে পুলিশ কী করতে পারবে আর পারবে না, সে বিষয়ে হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে: ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না; খ. গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে; গ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে হবে ইত্যাদি।
৫. ক্রিকেটার নাঈম অভিযোগ করেছেন, পাঞ্জাবি পরা একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের কোনো পরিচয় দেননি, তিনি পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করেন। বলা হচ্ছে ওই লোক পুলিশের সোর্স। প্রশ্ন হলো, পুলিশের সঙ্গে কি তাদের সোর্সও অভিযানে যেতে পারে এবং গেলেও পুলিশের মতোই কাউকে মারধর করতে পারে? বাস্তবতা হলো, পুলিশের নানাবিধ ধান্দাবাজি বা ফিকিরের সঙ্গে এই সোর্সরা জড়িত থাকে। তারা নিজেদেরকে পুলিশের মতোই ক্ষমতাবান মনে করে।
৬. নাঈমের অভিযোগ, পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাকে গাড়িতে না তুলে সিএনজিতে উঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, পুলিশের গাড়িতে না নিয়ে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল?
৭. নাঈমের বাবা, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম সাংবাদিকদের জানান, ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত থানায় যান। ডিউটি অফিসার তাকে প্রথমে থানায় ঢুকতেই দেননি; দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তিনি থানায় প্রবেশের সুযোগ পান। নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশ এরকম কর্তৃত্ববাদী আচরণ করে কীভাবে? আইনেই কি পুলিশকে এরকম ক্ষমতা দেওয়া আছে, নাকি পুলিশের প্রশিক্ষণেই এসব শেখানো হয়?
৮. নাঈম হাসানকে মারধরের ঘটনায় খুলশী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় নাঈমকে মারধরে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে। পুলিশের সোর্স সোহেলকেও আটক করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, অভিযুক্ত ওসি, অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ সদস্য এবং তাদের সোর্সের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সেই অপরাধে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি কী হবে? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, এই ঘটনার তদন্ত কে করবে? পুলিশ নিজেই যদি বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে, সেখানে কতটুকু নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে? এমনিতেই পুলিশের তদন্ত ও প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ বেশ পুরোনো। উপরন্তু তারা যখন নিজেদের বাহিনীর লোকদের বিষয়ে তদন্ত করবে, সেখানে তারা কতটা নির্মোহ থাকে বা থাকতে পারে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ক্রিকেটার
- মারধর
- হেনস্তার শিকার
- নাঈম হাসান