প্রস্তাবিত বাজেট: বড় সংখ্যা কি বড় পরিবর্তন আনে

www.ajkerpatrika.com এম এম মুসা প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ১০:০৭

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার ডাফলো তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ‘দারিদ্র্য বিমোচনের বড় পরিকল্পনা প্রায়ই ব্যর্থ হয়, যখন তা মাঠের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।’ তাঁরা ‘পুওর ইকোনমিকস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন—দরিদ্র মানুষের আচরণগত বাধা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে কীভাবে সুচিন্তিত নীতিও ব্যর্থ হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে এই দৃষ্টিতে বিচার করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কি সত্যিই দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাবে? নাকি মধ্যস্তরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে যাবে? এ বিশ্লেষণে আমি মূলত তিনটি খাত—সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করব।


ফ্যামিলি কার্ড: প্রতিশ্রুতি ও প্রমাণ


বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। ৪১ লাখ নারীকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এর জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাঁচ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার ডাফলোর র‍্যান্ডমাইজড কনট্রোলড ট্রায়াল (আরসিটি) পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে হবে—এই নগদ হস্তান্তর কি সত্যিই কল্যাণ বাড়াবে? বৈশ্বিক প্রমাণ মূলত ইতিবাচক। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর হাতে নগদ হস্তান্তর পরিবারের পুষ্টি, শিশুশিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মেক্সিকোর ‘ওপর্তুনিদাদেস’, ব্রাজিলের ‘বোলসা ফামিলিয়া’ এবং ভারতের ‘জনধন’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা এই ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।


তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ বিশাল। প্রথমত, সুবিধাভোগী নির্বাচনপ্রক্রিয়া—কারা পাবেন, কারা পাবেন না—এই তালিকা তৈরি করতে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ‘লিকেজ’ বা তালিকা থেকে প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্তদের অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো—সরকার ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে চাইছে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এখনো পর্যাপ্ত নয়।


শিক্ষা বিনিয়োগ: পরিমাণ বনাম মান


শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেশি। বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষায় অর্থ ব্যয় এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধি এক বিষয় নয়।


ভারতে পরিচালিত ‘প্রথম’ কর্মসূচির গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেয়ে শিক্ষার্থীর দক্ষতা স্তর অনুযায়ী শিক্ষণ পদ্ধতি পরিবর্তন অনেক বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পঞ্চম শ্রেণিতেও দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়তে পারে না।


বাজেটে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এগুলো প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহব্যঞ্জক। তবে তথ্য-প্রমাণ বলছে, প্রযুক্তি একা শিক্ষার মান বাড়ায় না; দরকার শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তন। বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামোর জন্য স্পষ্ট বরাদ্দ ও কর্মসূচি অনুপস্থিত। তবে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রবর্তন—জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি—একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা তৈরির এই উদ্যোগ ডাফলোর ‘শ্রমবাজার ও মানব পুঁজি’ গবেষণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।


স্বাস্থ্য বিনিয়োগ: বাস্তবায়নের জটিলতা


স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট এবং ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা, ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ (৮০ শতাংশ নারী) এবং জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল গঠন—এগুলো সঠিক পদক্ষেপ।


তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের কার্যকারিতার ইতিহাস প্রমাণ করে যে বরাদ্দ বৃদ্ধি মাত্রই পরিষেবার মান বৃদ্ধি নয়। ভারতের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় দেখা গেছে, চিকিৎসক ও নার্সের অনুপস্থিতি, ওষুধের স্বল্পতা এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা কীভাবে বিনিয়োগকে নিষ্ফল করে। বাংলাদেশেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপস্থিতি দীর্ঘকালীন সমস্যা। ওষুধের সংকট তো রয়েছেই।


হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যুর প্রসঙ্গে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে টিকাদান কর্মসূচিতে অবহেলা হয়েছিল এবং প্রথম ১০০ দিনে শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়েছে। এই স্বীকৃতি ও দ্রুত পদক্ষেপ সমস্যাটি চিহ্নিত করা ও পরীক্ষিত হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও