মাছ চাষ : সাফল্য থেকে টেকসই উন্নয়নের পথে

যুগান্তর মো. সামছুল আলম প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৪

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতে মাছ, মৎস্য গবেষক, মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। এটি এখন কেবল আমিষ বা খাদ্যের উৎস নয়, এটি বাঙালির জীবিকা, পুষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। এ বাস্তবতা সামনে রেখে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট সারাদেশে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬’। এবারের প্রতিপাদ্য-‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।


মৎস্য খাতের পরিসংখ্যান এ খাতের শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রমাণ। ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬’ উপলক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মাছের উৎপাদন এখন ৫১.১১ লাখ টন। মানুষের দৈনিক মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬৭.৮০ গ্রাম, যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় মাছের গুরুত্ব বহন করে। শুধু তাই নয়, দেশের ১৪ লাখ নারীসহ দুই কোটির বেশি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। মাছ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গবেষক, কৃষক, জেলে, চাষি, পোনা উৎপাদক, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহকারী, পরিবহণকারী, ব্যবসায়ী ও প্রক্রিয়াজাতকারীসহ একটি বিশাল জনগোষ্ঠী।


জাতীয় অর্থনীতিতেও মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২.৫৮ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে ২২.০৩ শতাংশ এবং মৎস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৪১ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান বলছে, মৎস্য খাত এখন আর কৃষির একটি ছোট উপখাত নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান গৌরবময়। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ম, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে ২য়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে ৩য়, বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম এবং সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলাশয়ে ক্রাস্টাশিয়া আহরণে ৮ম অবস্থানে রয়েছে।


এসব অর্জন প্রমাণ করে-নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, পুকুর এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক জলসীমাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব মৎস্য খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এ সাফল্য ধরে রাখতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে বর্তমানে ৮২৭টি অভয়াশ্রম স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব অভয়াশ্রমের মধ্যে ৪৫৫টির ব্যবস্থাপনা ও মেরামতে ১৮১.৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উপকরণ বিতরণ, প্রদর্শনী খামার এবং নতুন অভয়াশ্রম স্থাপনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ায় না, জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং মৎস্য খাতে সাফল্যের অন্যতম প্রতীক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ টন, যা মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১০ শতাংশ। ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ৪৩২ কি.মি. দৈর্ঘ্যরে ৬টি অভয়াশ্রম করা হয়েছে। মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা এবং ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৪১ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।


মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণকালীন জেলেদের সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রকৃত জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত না করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সফল করা কঠিন। এক্ষেত্রে সরকারকে যথাযথ মনিটরিং ও জবাবদিহির কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মৎস্য খাতের আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো সুনীল অর্থনীতি। প্রতিবছর ৫৮ দিন সব ধরনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সামুদ্রিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে নতুন প্রজাতি শনাক্ত এবং সামুদ্রিক সম্পদের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


সরকারি উদ্যোগে সামুদ্রিক ভেটকি মাছের সফল প্রজনন ও বাণিজ্যিকভাবে পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এসব উদ্যোগ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও মৎস্য খাতের ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬,১৪৪.৯১ কোটি টাকা মূল্যের ৯০,৬১৯.৪২ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে শুধু কাঁচা বা প্রচলিত পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে।


চিংড়ি উৎপাদনে ক্লাস্টার পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণে HACCP পদ্ধতি এবং বিশ্বমানের মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং ইট্রেসেবিলিটি সিস্টেম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে চিংড়ি খাতে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২.৯৯ লাখ টন। একই সময়ে এসপিএফ বাগদা চিংড়ির পিএল উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে স্যাটেলাইট ম্যাপিং, হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে এবং চিংড়ি খামারসংলগ্ন ৩৪টি খাল পুনঃখননের উদ্যোগ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও টেকসই করতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও