ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া বধ: জাতিগত প্রেরণার এক দারুণ গল্প
আরিফ হাসান অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী একজন বাংলাদেশি। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার কুমিল্লার এই তরুণের জন্য রবিবারটা ছিল অন্য রকম। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও রাস্তায় নামতেই বেশ কিছু প্রতিবেশী এসে হেসে হেসে কথা বলছিলেন। অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। বাংলাদেশ নামটা তাঁদের অজানা না হলেও, বেশির ভাগেরই ধারণা ছিল দেশটা মূলত বহুদূরের সমস্যাসংকুল একটা গরিব দেশ। লোকরঞ্জনবাদের এই রমরমা সময়ে কেউ কেউ এমন ধারণাও করেন যে তাঁদের চাকরি খেয়ে দেওয়ার জন্যই এসব দেশ থেকে লোকজন ভিড় জমায়।
যদিও আরিফের মতো পরিশ্রমী, দক্ষ, বন্ধুবৎসল মানুষেরা এই ধারণা একটু একটু করে দূর করে দেয়। তবে রবিবার এমন একটা ব্যাপার ঘটল, সেই ব্যাপারটা জাদুর মতো কাজ করল। খেলাধুলা পাগল, নিজেদের জাতীয় দল নিয়ে ভীষণ গর্ব করা অস্ট্রেলীয়রা টের পেলেন যে বাংলাদেশ তাঁদের টেস্ট ম্যাচে হারিয়ে দিয়েছে। তাঁদের দেশের মাটিতেই, তাঁদের সেরা দলকে টানা চার দিন রীতিমতো আধিপত্য বজায় রেখে জিতে গেছে সেই দলটা, যাদের গণনাতেই ধরা হয় না।
এই গোনায় না ধরার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, দীর্ঘ ২৩ বছর পর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আমন্ত্রণ পেল। সেই সিরিজটাও হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ভেন্যুগুলোর বাইরে ডারউইন আর ম্যাকেইয়ের মতো অখ্যাত ভেন্যুতে। আর সিরিজটাও হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মৌসুমের অফ সিজনে। এমনকি সে রকমভাবে স্পনসরও পাওয়া যায়নি। খেলা তিন দিনের মধ্যে শেষ হবে ধরে নিয়ে গ্যালারির সবচেয়ে দামি অংশের চতুর্থ দিনের কোনো টিকিটই বিক্রি হয়নি।
যদিও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের সেরা দলটাই নামিয়েছে; কিন্তু তাদের শরীরী ভাষাতে প্রতিপক্ষের জন্য শ্রদ্ধার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের ম্যাচ শুরুর আগের বক্তব্যে ছিল তাচ্ছিল্যের সুর। দলের অভিজ্ঞ পেসার হ্যাজলউড দাবি করেন যে বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের কাছে যথেষ্ট ফুটেজ না থাকায় প্রস্তুতিটা ভিন্ন হয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে কেউ হয়তো এ কথায় এই গন্ধও পেতে পারেন যে আসলে বাংলাদেশ নিয়ে তাঁরা তেমন একটা ভাবেনইনি।
মিডিয়াও এতে হাওয়া দিয়েছে। টেস্ট দুই দিনেই শেষ হবে, বাংলাদেশ লজ্জাজনকভাবে উড়ে যাবে বলে চারদিকে ঠাট্টা–তামাশা চলছিল। মাসখানেক আগেই জিম্বাবুয়ের কাছে হারা এবং অস্ট্রেলিয়ায় এসে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশকে নিয়ে সেই আশঙ্কা বাড়াবাড়ি হয়তো ছিল না, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের প্রতিপক্ষ হিসেবে যতটা সম্মান পাওয়ার এর চেয়ে অনেকটাই কম পেয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া খুব হালকাভাবে নিয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকায় চরম পেশাদার অস্ট্রেলীয়রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিচলিত হয়ে পড়েন। মিচেল স্টার্কের মতো অভিজ্ঞতম খেলোয়াড় মেজাজ হারিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজকে স্লেজিং করেন। ক্যাচের বিশ্ব রেকর্ড করা স্টিভ স্মিথ একাধিক সহজ ক্যাচ ফেলেন। বিশেষ করে সীমানাদড়িতে তাসকিন আহমেদের ক্যাচটা ফেলার পরে মাথা নিচু করে থাকা স্মিথকে দেখে মনে হচ্ছিল ভেঙে পড়া এক মানুষ।
দুনিয়ার অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় গুণটা অস্ট্রেলীয়সুলভ দৃঢ়তা, অথচ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করার সময় দেখা গেল তিনি এতটাই হতবিহ্বল যে আম্পায়ার আঙুল তোলার আগেই রিভিউ চেয়ে বসেন। মনে হচ্ছিল যেন এক অস্থির কিশোর। আর বোল্ড হয়ে যাওয়ার পর দুনিয়ার অন্যতম আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান ট্রাভিস হেড অদ্ভুতভাবে থমকে দাঁড়ালেন। উইকেটের ছিটকে আসা বেলস আবার যথাস্থানে রেখে স্থাণু হয়ে রইলেন। ধারাভাষ্যকারেরা বলছিলেন, এ রকম অদ্ভুত আচরণ তাঁরা আগে দেখেননি।
এই ধারাভাষ্যাকারেরাই খেলা শেষে যখন খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন, তখন বললেন যে দেখুন দেখুন ওদের উচ্চতার পার্থক্য। এই ছোটখাটো ছেলেগুলো ওদের দেশে এসে ওদের ভূপাতিত করল। নিজেদের সম্মান আকাশে তুলে নিল।
ঠিক এই বোধটাই হচ্ছিল আরিফের মতো হাজারো প্রবাসীদের। গত শতকের অন্যতম সেরা দার্শনিক সিএলআর জেমস তাঁর ম্যাগনাম ওপাস বিয়ন্ড দ্য বাউন্ডারিতে দেখিয়েছিলেন যে ক্রিকেটের সাফল্য কীভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চলের কালো মানুষদের গোটা দুনিয়াজুড়ে সম্মান বাড়িয়েছিল।
বিশেষত ইংল্যান্ডের মাঠগুলোতে একেকটা জয়ের পরে বেলবটম প্যান্ট পরা, দিনভর উল্লাস করতে থাকা কালো মানুষদের ঢল নামত। মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের প্রভাবটা ছিল অনেক বেশি। এককালে যাঁদের দাস হিসেবে দেখা হতো, তাঁরা টের পেত মানুষ হিসেবে তাঁদের সম্মান কোনো অংশে কম না।
আধুনিক যুগে খেলার দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক সাফল্য এই সম্মান এনে দেয়, যা অন্যভাবে পাওয়া খুব মুশকিল। খেলাধুলার সাফল্য সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করে। সে দেশ ও দেশের মানুষ সমন্ধে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। যে কারণে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মানুষও বিন্দুমাত্র ফুটবল না বুঝে ফিফা বিশ্বকাপ নিজের দেশে আয়োজন করা নিয়ে মহা উৎসাহী হয়ে পড়েন।