সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

যুগান্তর মোহাম্মদ হাসান শরীফ প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৫

সরকার সবল রয়েছে, সরকারকে দুর্বল ভাবার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এমন দাবি করেছেন। তবে তিনি যা বলেননি, তা হলো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের শক্তি বা সক্ষমতা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না, বরং তা প্রমাণিত হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং সুশাসনের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই জনপ্রত্যাশা ন্যূনতম মাত্রায় হলেও পূরণ করা। তবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাপক নির্বাচনি বিজয়ই সুশাসনের নিশ্চয়তা দেয় না; এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ তৈরি করে মাত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখা নির্ভর করে সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ওপর।


রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সরকারের সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার তত্ত্ব খুবই প্রাসঙ্গিক। ওয়েবারের মতে, রাষ্ট্রে মূল সংজ্ঞা হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগের বৈধ একচ্ছত্র অধিকার। একটি সরকার কতটা ‘সবল’ বা সক্ষম, তা নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামো অপরাধ দমনে কতটা নিরপেক্ষ ও দ্রুত ভূমিকা রাখতে পারছে তার ওপর। যখন সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন সরকারের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।


সাম্প্রতিক কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত পাঁচ দশকের পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ মধ্যরাতে হামলা, লুটপাট ও দখলের চেষ্টা এবং পরবর্তীকালে ইসিবি চত্বরে জনপ্রিয় ও আলোচিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ও সংশ্লিষ্ট আবাসন প্রকল্পে দীর্ঘ সময় ধরে তাণ্ডব চালানোর ঘটনা দুটি প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রক্রিয়ায় ঘাটতি নির্দেশ করে। দুটি ঘটনাই স্থানীয় প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি প্রকটভাবে প্রকাশ করে। স্থানীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা যে কোনো সরকারের জন্য প্রাথমিক দায়িত্ব।


জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক পেশাদারত্ব খুবই জরুরি। আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ‘ইন্সটিটিউশনাল ডিকে’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অবনমনের যে ধারণা রয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ সংগঠনের সময় নিষ্ক্রিয় থাকে এবং পরে সামাজিক বা গণমাধ্যমের ব্যাপক চাপের পর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে অনাস্থা তৈরি হয়। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার বা লুটের মালামাল উদ্ধার ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, তা অপরাধ প্রতিরোধের প্রাথমিক ব্যর্থতাকে ঢাকা দিতে পারে না। অপরাধ সংগঠনের আগেই তা নস্যাৎ করার জন্য প্রয়োজন কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিতকরণে আসল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াটাও অপরিহার্য। আর তা করা দরকার বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই দ্রুততার সঙ্গে।


রাষ্ট্রচিন্তা ও নীতিনির্ধারণী গবেষণায় দেখা যায়, পরিসংখ্যানিক অগ্রগতির চেয়েও সাধারণ মানুষের মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রধান নিয়ামক। সরকারকে পরিসংখ্যান দিয়ে দেশ চালাতে চাইলে তা ফলপ্রসূ হবে না। সরকারের কেউ কথায় কথায় পরিসংখ্যান দিয়ে জানাবে, আগের চেয়ে অপরাধ কমেছে, কিন্তু জনগণ ভিন্ন খবর দেখবে, তা হিতে বিপরীত পরিস্থিতিই সৃষ্টি করবে। পরিসংখ্যানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনমানসের ধারণা। দেশে যখন মূল্যস্ফীতির হার চড়া রয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, চাকরিবাজার থমকে রয়েছে, নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে না, তখন আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জনমানসের ধারণা সরকারকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে বাধ্য।


রাষ্ট্রযন্ত্র যখন জনগণের মাঝে এ আস্থার সংকট তৈরি হতে দেয়, তখন শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আধুনিক সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের প্রবক্তা জন লক সরকারের সামাজিক দায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের অধিকার ও সামাজিক শান্তি রক্ষা করা। যখন রাষ্ট্র এই ট্রাস্ট বা জনগণের বিশ্বাস রক্ষা করতে পারে, তখনই সমাজে স্থায়িত্ব আসে।’

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও