বিশ্ব প্রবীণ দিবস : অবহেলা নয়, প্রয়োজন পরম যত্ন ও মর্যাদা
১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও প্রবীণদের অধিকার, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই দিনটি পালিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী গড় আয়ু বাড়ছে, যার ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এক সমীক্ষা অনুসারে, ২০২৪-২০২৬ সালে বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ (প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ)। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখে, যা হবে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ থেকে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ৫ জন নাগরিকের মধ্যে ১ জন হবেন প্রবীণ। তবে এই বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে প্রবীণদের প্রতি সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের পরিধি। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা কোনো বোঝা নন, বরং তারা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির বটবৃক্ষ।
একটি গাছের শিকড় যেমন গাছটিকে মাটির সাথে শক্ত করে ধরে রাখে এবং ঝড়-ঝাপটা থেকে রক্ষা করে, প্রবীণরা তেমনি আমাদের সমাজ ও পরিবারের শিকড়। তাদের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও ত্যাগ আমাদের আজকের সুন্দর বর্তমান গড়ে তুলেছে। শৈশব থেকে শুরু করে যৌবনের প্রতিটি ধাপে তারা আমাদের যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তা কোনো বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়। তাদের এই সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তরুণ প্রজন্মের জন্য পথ চলার আলোকবর্তিকা হতে পারে।
বয়সের সাথে সাথে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা কমতে থাকে। প্রবীণ বয়সে মানুষ নানা রকম ক্রনিক রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হন, যার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যা। কিন্তু আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও একক পারিবারিক কাঠামোর কারণে অনেক সময় প্রবীণরা চরম অবহেলার শিকার হন।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশের বেশি প্রবীণ মানুষ কোনো না কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রবীণ একসাথে ৫টি ভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। অনিদ্রা (৩৯.২ শতাংশ), চোখের সমস্যা (৩৭.৬ শতাংশ), বাত-ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস প্রবীণদের প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশের সিংহভাগ প্রবীণ উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা পান না। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত খরচ, হাসপাতালে প্রবীণবান্ধব চিকিৎসার অভাব এবং যাতায়াত সমস্যা।
ব্যস্ততার অজুহাতে পরিবারের সদস্যরা তাদের সময় দিতে চান না। এই একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করে, যা তাদের দ্রুত বার্ধক্য ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের মতামতকে গুরুত্বহীন মনে করা হয়, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হানে।
দ্রুত নগরায়ণ এবং একক পরিবার বৃদ্ধির কারণে প্রবীণদের মধ্যে একাকীত্ব এবং মানসিক বিষণ্নতা তীব্রভাবে বাড়ছে। ৫০ শতাংশের বেশি প্রবীণ নিঃসঙ্গ বা বিধবা/বিপত্নীক জীবনযাপন করছেন। প্রবীণ পুরুষদের তুলনায় প্রবীণ নারীদের জীবনযাত্রার মান এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি খারাপ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ব প্রবীণ দিবস