বিশ্বকাপ ফুটবল ও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা উন্মাদনার মনস্তত্ত্ব

প্রথম আলো হাসান ইমাম প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ২৩:৩৪

হবিগঞ্জের কাশীপুর গ্রামের মানুষ ২ জুন একটি ফুটবল ম্যাচ দেখছিল। সেটি ছিল স্থানীয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক তরুণদের প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার পরদিন যা ঘটল, তা ফুটবলের চেয়ে আমাদের ‘সমাজ’ ও ‘মনস্তত্ত্ব’ সম্পর্কেই বেশি আশঙ্কাজনক বার্তা দেয়। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, আহত হন অন্তত ৫০ জন। হাজার মাইল দূরের দুই লাতিন দেশের ফুটবল-আবেগ বাংলাদেশের একটি গ্রামে রক্ত ঝরানোর কারণ হয়ে উঠল। এরপর ৯ জুন মানিকগঞ্জ সদরে পছন্দের দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ হারাল এক কিশোর।


২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময়ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটবল সমর্থনকে কেন্দ্র করে এমন বহু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছিল। কয়েকটি এলাকায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরোধ হাতাহাতি, ভাঙচুর ও রক্তপাতে গড়ায়। কোথাও পতাকা টাঙানো নিয়ে, কোথাও–বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়।


ঘটনাগুলো যতটা দুঃখজনক, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়করভাবে আমাদের এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যে তরুণ হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, তিনি কখনো ব্রাজিলে যাননি; যাঁর সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয়েছে, তিনিও আর্জেন্টিনার মাটিতে পা রাখেননি কোনো দিন। অথচ তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন। এখানেই আমাদের একটু থমকে দাঁড়ানো দরকার।


ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু এর সমর্থনকে কেন্দ্র করে আমরা মাঝেমধ্যে এমন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি, যার সঙ্গে খেলার প্রকৃত দর্শনের দূরতম সম্পর্ক নেই।


কেউ হয়তো যুক্তি দিতে পারেন, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো ফুটবল-সংস্কৃতিকে বিচার করা ঠিক নয়। তা সত্য বটে, কিন্তু এসব ঘটনা যে সামাজিক অসহিষ্ণুতার দিক উন্মোচিত করে, তা তো অস্বীকার করার জো নেই।


খেলার জন্ম আনন্দে, বৈরিতায় নয়


ফুটবলের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। ইতিহাসবিদেরা এর শিকড় খুঁজে পান প্রাচীন চীনের ‘চুজু’ নামের এক খেলায়। পরে ইংল্যান্ডে আধুনিক ফুটবলের যাত্রা এবং অল্প সময়ের মধ্যে এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছায়। কিন্তু ফুটবলের প্রকৃত শক্তি ইতিহাসে নয়, এর সরলতায়। একটি বল আর একটু খোলা জায়গা—এ দুয়ের ব্যবস্থা হলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ একই আনন্দে শামিল হতে পারে। উন্নত দেশ থেকে অনুন্নত অঞ্চল, যান্ত্রিক শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—ফুটবল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত। এ কারণেই অনেক সমাজবিজ্ঞানী ফুটবলকে সবচেয়ে ‘গণতান্ত্রিক খেলা’ আখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু সেই সত্য বহু আগেই আবিষ্কার করেছে।


গ্রামবাংলায় শৈশব-কৈশোরে অনেকেরই কাছে ‘জাম্বুরা’ ছিল ফুটবল, কারও কাছে পুরোনো ছেঁড়া কাপড় গুটিয়ে বানানো ‘বল’ই ছিল ভরসা। বর্ষার কাদামাখা মাঠে, ধান কাটা জমিতে, স্কুলপ্রাঙ্গণে কিংবা বাড়ির উঠোনে খালি পায়ে ছুটে বেড়ানো হাজারো শিশু-কিশোরের নস্টালজিয়ার নাম ফুটবল। যে শিশুটি দামি খেলনা কেনার সামর্থ্য রাখত না, তারও থাকত এ খেলায় সমান হিস্যা। অর্থ বা আভিজাত্য নয়, সাম্য আর আনন্দই এর মূলধন। দুঃখের কথা, সেই অকৃত্রিমতা আজ ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে।


সীমিত হচ্ছে খেলাধুলার পরিসর


আজকের বাংলাদেশে ফুটবলকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই—আমরা খেলা নিয়ে তর্ক-বিতর্কে যতটা বুঁদ হয়ে থাকি, খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় ততটা ভাবিত নই।


এক ঢাকা মহানগরের দিকে তাকালেই চমকে উঠতে হয়। এক হিসাব বলছে, রাজধানীতে মোট ২৩৫টি খেলার মাঠ থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত মাত্র ৪২টি। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে কোনো মাঠই নেই। ঢাকার বাইরের শহরগুলোর চিত্রেও খুব বেশি রকমফের নেই। এমনকি গ্রামাঞ্চলেও খেলার সুযোগ দিনকে দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।


অর্থাৎ আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে শিশু-কিশোরেরা মাঠে গিয়ে খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না, কিন্তু ‘গেম’ খেলায় পারদর্শী হচ্ছে। আর সেটা অনলাইনে, ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায়। এ এক অদ্ভুত বিদ্রূপ!


ফুটবল তো শুধু খেলা নয়; এটি কায়িক ও মানসিক সুস্থতার অন্যতম মাধ্যমও বটে। খেলাধুলা শরীরকে সক্রিয় রাখে, হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখে, মানসিক চাপ কমায়। একই সঙ্গে তা দলগত কাজ, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলে। একটি কিশোর মাঠে খেলতে গিয়ে শুধু গোল করতে শেখে না; সে সতীর্থকে সহযোগিতা করতে শেখে, পরাজয়কে হাসিমুখে মেনে নিতে শেখে এবং পরের দিন নতুন উদ্যমে মাঠে ফিরে আসার শিক্ষা পায়। অথচ মাঠ হাপিস করে দিয়ে সেই জীবনমুখী শিক্ষাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করছি।


যে শিক্ষা খেলার মাঠ দিতে পারে, তা কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। আজকের শিশু-কিশোরেরা মাঠে দৌড়ানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে বেশি পোক্ত হয়ে উঠছে। তাই তাদের মাঠে ফিরিয়ে নেওয়ার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। পরিবারে-সমাজে এমন পরিবেশ থাকবে, যেখানে হার-জিত নিয়ে সুস্থ হাসিঠাট্টা হতে পারে, কিন্তু কোনো বিদ্বেষ থাকবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়াও সমান জরুরি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও