তোষামোদের রাজনৈতিক অর্থনীতির শেষ কোথায়?
পৃথিবীজুড়ে তোষামোদের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। চাটুকারিতার মূল আখড়া ছিল বিভিন্ন রাজ্যের রাজসভা। রাজারা ভালোবাসতেন সভাসদ, মোসাহেব ও চাটুকার পরিবৃত হয়ে থাকতে। এসব তোষামোদকারীর মূল কাজ ছিল রাজার গুণগান করা, তাঁর মহত্ত্বের বারবার ঘোষণা এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার।
এ প্রক্রিয়ায় রাজাও একধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন, যা কখনো কখনো আত্মম্ভরিতায় পরিণত হতো। তোষামোদের ব্যাপারটি শুধু রাজ্য বা রাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে জমিদার ও ধনকুবেরদের মধ্যেও তা প্রচলিত ছিল। আসলে অর্থ, সম্পত্তি, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই চাটুকার ও মোসাহেবরা এসে জমে—এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
তবে রাজরাজড়ার জগতের বাইরে সাধারণ জীবনপ্রবাহেও তোষামোদ বিরাজ করে। দপ্তরপ্রধানের সঙ্গে অধস্তন কর্মচারীদের, প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা-আকাঙ্ক্ষীদের, সম্পদশালীদের সঙ্গে সম্পদহীনদের তোষামোদের কাহিনি সর্বজনবিদিত। সামষ্টিক পর্যায়ে রাজনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গনে তোষামোদের মাত্রিকতা, গভীরতা ও প্রভাব অনেক বিস্তৃত, তোষামোদের রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রাসঙ্গিকতা বেশি।
তোষামোদের রাজনীতি দিয়েই শুরু করা যাক; বরং বলা চলে রাজনীতির তোষামোদ নিয়েই আলোচনা শুরু হতে পারে। এ প্রসঙ্গে দুটি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এক. আমাদের দেশের রাজনীতি মোটামুটিভাবে তোষামোদেরই রাজনীতি—তোষামোদ বড় প্রকট শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মধ্যস্থানীয় নেতাদের, বৃহৎ নেতার সঙ্গে ক্ষুদ্র নেতার কিংবা নেতার সঙ্গে কর্মীর। দুই. তোষামোদের রাজনীতির একটি গতিময়তা আছে। ব্যাপারটি স্থবির নয়—এ প্রক্রিয়ায় তোষামোদকারী ও তোষিতের মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি বদলায়, পাল্টায় সার্বিক পরিপ্রেক্ষিত।
তোষামোদের রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে আনুকূল্য লাভ—রাজনৈতিক আনুকূল্য, সুবিধার আনুকূল্য, অর্থের আনুকূল্য, ক্ষমতার আনুকূল্য। নানান প্রকারের সুবিধা বাগানোই হচ্ছে তোষামোদের রাজনীতির একটি মুখ্য উদ্দেশ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ–জাতীয় আনুকূল্য লাভের প্রচেষ্টা তোষামোদকারীদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়—কে কত বেশি বাগাতে পারে। এমন অনভিপ্রেত প্রতিযোগিতা প্রতিহিংসার আবহ সৃষ্টি করতে পারে তোষামোদকারীদের মধ্যে।
তবে তোষামোদের রাজনীতির অন্যতম মাত্রিকতা হচ্ছে তোষিত নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলা। মিথ্যা স্তবগানে, ফাঁকা প্রশংসার মাধ্যমে তোষামোদী অনুগামীরা তোষিত নেতাকে এ মিথ্যা ধারণা দিতে চেষ্টা করে যে তিনিই সর্বজ্ঞানী, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। এ–জাতীয় একটি প্রক্রিয়া নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে।
বাংলাদেশের অতীত রাজনীতিতে এমন ঘটনা আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি। নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করার মাধ্যমে অনুগামীরাও স্বেচ্ছাচারিতার ছাড়পত্র পেয়ে যায়, যার ফলে তারাও সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের সুযোগ লাভ করে। তোষামোদের রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা এবং বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়ার প্রতিফলন আমরা বহুবার লক্ষ করেছি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক অর্থনীতি