আমেরিকান গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চূড়ান্ত প্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট অতীতে যা করেছেন অথবা বর্তমান প্রেসিডেন্ট যা করছেন, সেটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় হোক অথবা গভীর সমুদ্রে, কিংবা ইরান বা ভেনিজুয়েলায়, এমনকি দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসী কমিউনিটিগুলোর বিরুদ্ধে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টে’র (আইস) নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনা হোক-সবই আমেরিকান গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বোমাবর্ষণ এবং সে দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় এ কাজ করেছে, ১৯৮৯ সালে পানামায় করেছে এবং ১৫ বছর আগে লিবিয়ায় করেছে। যদিও লিবিয়ার ক্ষেত্রে দেশটির প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও স্থানীয় বাহিনীর দ্বারা আটক করে, নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। বিগত ৭৫ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ২১টি দেশে হামলা, অভিযান অথবা ওইসব দেশের নেতাদের উৎখাত করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এ দেশগুলো হচ্ছে : গুয়েতেমালা, গ্রেনাডা, পাকিস্তান, সোমালিয়া, কিউবা, সুদান, পানামা, লিবিয়া, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, এল সালভেদর, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, নিকারাগুয়া, লেবানন, লাওস, ভেনিজুয়েলা এবং ডোমিনিকান রিপাবলিক। এছাড়া আরও অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভ্যুত্থান অথবা দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৫৫ হাজার আমেরিকান এবং প্রায় ২০ লাখ ভিয়েতনামী নিহত হয়েছিলেন। রোড আইল্যান্ডে অবস্থিত ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’র রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯/১১-এর পর গত সিকি শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত সহিংসতায় ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ লাখ লোক নিহত হয়েছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথমদিকে যুদ্ধে অগ্রগতির প্রমাণ হিসাবে প্রতিপক্ষের নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হতো। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরবর্তী সময়ে নিহতের সংখ্যা কমিয়ে দেখাত অথবা অনেক ক্ষেত্রে অস্বীকার করত। সরকার সব সময় দাবি করত, তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভিয়েতনাম আগ্রাসী শক্তি, তারা কমিউনিস্ট, তারা প্রতিবেশী ও বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ-তারা ইসলামি সন্ত্রাসী অথবা মাদক পাচারকারী, ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উৎপাদক ও মজুতকারী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আমেরিকার সমৃদ্ধির পথে অন্তরায়। দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা চালানোর পর উচ্চপদস্থ আমেরিকান কর্মকর্তারা কখনো নৈতিক অথবা আইনগতভাবে দোষ স্বীকার করেননি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভুল ছিল, কিন্তু অপরাধ ছিল না। ভেনিজুয়েলায় আমেরিকান অভিযানের ফলাফল শেষ পর্যন্ত যাই হোক না কেন, আমেরিকান প্রশাসন নৈতিকভাবে নতি স্বীকার করবে বা ক্ষমা প্রার্থনা করবে, এমন আশা করার কোনো কারণ নেই।
ভেনিজুয়েলায় আমেরিকান বাহিনীর অভিযান ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। কেবল পার্থক্য, যুক্তরাষ্ট্রের একজন অহংকারী প্রেসিডেন্ট তার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে কোনো রাখঢাক করেন না, ফলাফল কী হবে তার তোয়াক্কা করেন না। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে আমেরিকান ভূখণ্ডে এনে বিচারের মুখোমুখি করেছে। অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ট্রাম্পের কথাগুলো অর্ধসত্য ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং ভেনিজুয়েলার সাবেক সরকার তাদের ১৯৭৬ সালে জাতীয়করণ আইন প্রয়োগ করে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর যে সম্পত্তি ‘চুরি’ করেছিল তা আদায় করা। প্রকৃতপক্ষে ভেনিজুয়েলার জাতীয়করণ আইন ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত ছিল। কিন্তু এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও করপোরেট স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখেছিল। ভেনিজুয়েলা সরকার দুই প্রধান তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্রেওল পেট্রোলিয়াম’ এবং বহুজাতিক ‘শেল অয়েল’কে এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছে। এ ছাড়া বিদ্যমান সার্ভিস চুক্তিগুলোও বহাল রেখেছে। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এক আদেশ জারি করেন যে, বিদেশি তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলার তেল রাজস্বের একটি ছোট অংশ লাভ করবে। এ আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হলে বড় বড় পেট্রোলিয়াম কোম্পানি, বিশেষ করে ‘এক্সনমোবিল’ ও ‘কনোকো/ফিলিপ’ অসন্তুষ্ট হয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করে। ভেনিজুয়েলা আদালতের আদেশের চেয়ে একটি ছোট বন্দোবস্তে সম্মত হয়েছে এবং আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আদালত ক্ষতিপূরণের মামলার যে রায় প্রদান করে, ভেনিজুয়েলা সরকার তার চেয়ে কম ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়। ফলে উভয়পক্ষে আলোচনা অব্যাহত থাকে।
১৯৯০-৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে আমেরিকান হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবাদকারীরা স্লোগান উচ্চারণ করেছিল, ‘তেলের জন্য কোনো রক্তপাত নয়’। কিন্তু ট্রাম্পের ঘোষণা ছিল হতবাক করার মতো। তিনি তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ ওয়েবসাইটে লিখেছেন, ‘আমি একথা ঘোষণা করতে পেরে আনন্দিত যে, ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল উচ্চমানের তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে। এ তেল বাজারমূল্যে বিক্রয় করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে সে অর্থ আমার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, যাতে তা ভেনিজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ভেনিজুয়েলায় আমেরিকান বাহিনীর হামলা ও প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণের সঙ্গে মাদক পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই, যে অভিযোগ তিনি অভিযানের আগে বারবার উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কগুলো ভালোভাবে জানে, ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের ঘটনা ঘটে না বললেই চলে। ফলে, ভেনিজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক অভিযান চালানোর পেছনে ছিল লোভ ও করপোরেট চাহিদা পূরণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনি অভিযানে বড় বড় তেল কোম্পানি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার সংস্থান করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে গিয়ে সুদে-আসলে সেই বিনিয়োগ ফেরত দিচ্ছেন। ভেনিজুয়েলা অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের কার্যকারিতা ভূতাপেক্ষ বা আগে থেকে শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা কার্যকর থাকবে। পৃথিবীর একটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশের ওপর চলমান অভিযানটি যদি তেলের জন্য যুদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের অভিযানগুলোও অনিবার্যভাবে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ ছিল। ১৯৯১ সালে ‘কুয়েত সীমান্তের পবিত্রতা’ রক্ষার ব্যাপারে সিনিয়র বুশের হস্তক্ষেপ-পূর্ব এবং ২০০৩ সালে ইরাকে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র’ উৎপাদন বন্ধ করতে জুনিয়র বুশের হস্তক্ষেপ-পূর্ববর্তী কথামালার যৌক্তিকতাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এখন প্রকাশ্যেই স্বীকার করা হচ্ছে যে, তাদের কথাগুলো ছিল ইরাকে হামলা চালানোর অজুহাত এবং বিশ্বের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কৌশল। ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি থেকে এটা স্পষ্ট যে, আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির সমগ্র কাঠামোতে ছড়িয়ে আছে মিথ্যাচারের জাল, যা আমেরিকান প্রশাসনের স্বার্থে যখন যাকে যেভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন, সেভাবে চিহ্নিত করতে কোনো দ্বিধা করে না। আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র ব্যতিক্রমী বিষয় হলো এর প্রতারণা এবং এর আড়ালে আমেরিকার বিপুল সামরিক বাজেট, যা বিশ্বের সব দেশের সম্মিলিত বাজেটের চেয়েও বেশি।