নির্বাচিত সরকারের কাছে পর্যটন খাতের প্রত্যাশা : টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের প্রত্যাশাও নতুনভাবে জন্ম নেয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব খাতের মতোই পর্যটন খাতও তাকিয়ে থাকে নীতিনির্ধারকদের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ পর্যটন কেবল বিনোদন নয়; এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির শক্তিশালী মাধ্যম।
বাংলাদেশের পর্যটনের ভিত্তি তার অনন্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবন, প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ঢাকার মাইস ট্যুরিজম—সব মিলিয়ে সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই।
তবু আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন, গড় ব্যয় এবং অবস্থানকাল—সব ক্ষেত্রেই আমরা এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। এ অবস্থায় নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রথম প্রত্যাশা—একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পর্যটন নীতি, যেখানে অবকাঠামো, বিপণন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা একসঙ্গে বিবেচিত হবে।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন খুবই জরুরি (বিশেষ করে হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)। বিভিন্ন পর্যটন করিডোর উন্নয়ন (ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-বান্দরবান) নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে থাকা আবশ্যক। আধুনিকে বিশ্বে প্রতিটি স্থানে স্মার্ট সাইনেজ, ভিজিটর ইনফরমেশন সেন্টার থাকলে পর্যটন শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং ভ্রমণ সহজ, নিরাপদ ও সময়-সাশ্রয়ী হয়।
পর্যটন বিকাশের পূর্বশর্ত নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। আঞ্চলিক বিমানবন্দর উন্নয়ন, সড়ক ও রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, পর্যটন-সহায়ক সাইনেজ ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন—এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
একই সঙ্গে ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন অনলাইন ভিসা, ই-টিকিটিং, পর্যটন তথ্যভাণ্ডার—এই খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে ডেটা-ড্রিভেন নীতি পর্যটক আগমন, ব্যয়, অবস্থানকাল—রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ এই শিল্পের উন্নয়নে সম্যক ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টিং চালু করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের জন্য হুমকি। সেন্ট মার্টিনে প্রবাল ক্ষয়, সুন্দরবনে দূষণ, পাহাড়ি অঞ্চলে বর্জ্য সমস্যা—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। নতুন সরকারের উচিত ‘কোয়ালিটি ওভার কোয়ান্টিটি’ নীতি গ্রহণ করা—অর্থাৎ কম পর্যটক কিন্তু উচ্চ ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করা।
ইকো-ট্যুরিজম, কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম এবং সবুজ সার্টিফিকেশন চালু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার করা গেলে পর্যটন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। পরিবেশ গবেষক জিওফ্রে ওয়াল দেখিয়েছেন যে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করে—বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পর্যটন খাত