সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও করণীয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় ছয় মাসের কার্যক্রম এখন একটি প্রাথমিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ছয় মাস কোনো সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট সময় নয়; তবে সরকারের গতিপথ, অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বোঝার জন্য এ সময় একেবারে কমও নয়। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক অর্জন হলো নির্বাচিত রাজনৈতিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার পর একটি নির্বাচিত সংসদ ও সরকার কার্যকর হওয়া দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


সরকারের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো-শুরুতেই অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সহায়তামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সরাসরি সুবিধা পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ইতিবাচক। তবে এসব কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের ছয় মাসের চিত্র অবশ্য মিশ্র। সরকার এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও পরিবহণ ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।


এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ধরে রাখা জরুরি। তবে বিদেশি ঋণ গ্রহণই অর্থনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেই বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে-এসব প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। একজন সাধারণ নাগরিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা সামষ্টিক অর্থনীতির জটিল হিসাবের চেয়ে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বাসা ভাড়া ও পরিবহণ ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিচার করেন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যদি মানুষের আয়ের তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের দাবি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।


ব্যাংকিং খাতেও সমস্যা গুরুতর। বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা গ্রহণ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ছয় মাসে এ সংকট দূর করা সম্ভব নয়। তবে নতুন সরকারকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, ব্যাংকিং সংস্কারের ক্ষেত্রে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। অতীতে যারা অনিয়ম করেছে তাদের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনই বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ কেউ একই কাজ করলে তাকেও একই আইনের আওতায় আনতে হবে।


বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও ইতিবাচক। কিন্তু এখানেও আইনের শাসন এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিক অভিযোগ আর প্রমাণিত আর্থিক অপরাধ এক বিষয় নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা। জনগণ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং স্বাভাবিক জীবন প্রত্যাশা করে। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, মব বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো উদ্বেগ সৃষ্টি করে।


সুশাসনের প্রশ্নেও সরকারের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া তুলনামূলক সহজ; নিজের দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত পরীক্ষা। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা আমলা-যেই হোক না কেন, দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, ই-প্রকিউরমেন্ট সম্প্রসারণ এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যেতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও