সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বয়স নির্ধারণ প্রসঙ্গে

কালের কণ্ঠ এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৫

তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার), স্ন্যাপচ্যাটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন ও ব্যাবসায়িক কাজে যুক্ত হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির এই ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি উদ্বেগজনক একটি বিষয় হলো অল্পবয়সী শিশু-কিশোরদের অনিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার। বিশ্বের অনেক দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৩ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বেশির ভাগ প্ল্যাটফর্মেও একই নীতিমালা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশকে সুরক্ষিত রাখা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশু অভিভাবকের অজান্তে ভুল তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে সহজেই এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষণীয়। যে সময়ে একজন শিক্ষার্থীর বইপড়া, খেলাধুলা, সৃজনশীল চর্চা ও পারিবারিক মূল্যবোধ অর্জনের কথা, সে সময়ের একটি বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও দেখা, মন্তব্য করা, লাইভ করা কিংবা বিভিন্ন ট্রেন্ড অনুসরণে ব্যয় হচ্ছে। এতে শিক্ষার প্রতি মনোযোগ কমছে, পড়াশোনার অভ্যাস নষ্ট হচ্ছে এবং বাস্তব জীবনের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জীবনের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ছে।


অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করায় ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। ফলে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, শিক্ষাগত ও জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।


বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার শিশু-কিশোরদের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। টিকটক বা অন্যান্য স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। জনপ্রিয়তা অর্জনের আশায় কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ ভিডিও তৈরি করে, আবার কেউ অশালীন ভাষা, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য কিংবা অনলাইন হয়রানির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ব্ল্যাকমেইল, গেমিং আসক্তি, অনলাইন প্রতারণা এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের প্রলোভনের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কিশোরদের অপরিপক্ব মানসিকতা তাদের অনেক সময় সত্য-মিথ্যা তথ্য যাচাই না করেই গুজব ছড়াতে উদ্বুদ্ধ করে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে চোখের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। বাংলাদেশের অনেক পরিবারে অভিভাবকরা কর্মব্যস্ত থাকায় সন্তানদের ডিজিটাল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। আবার অনেক অভিভাবক নিজেরাই প্রযুক্তি ব্যবহারে পর্যাপ্ত দক্ষ না হওয়ায় সন্তান কী দেখছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা বুঝতে পারেন না। স্কুল পর্যায়েও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও সচেতনতা এখনো সর্বত্র গড়ে ওঠেনি। ফলে শিশুরা সহজেই ভুয়া তথ্য, ক্ষতিকর কনটেন্ট, অনলাইন জুয়া, প্রতারণা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংস্পর্শে চলে যেতে পারে। এসব কারণে শুধু একটি বয়সসীমা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং কার্যকর তদারকি, সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি।


গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৩ থেকে ৮৫ শতাংশ শিশু আন্তর্জাতিক সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে বেশি দৈনিক স্ক্রিন টাইম (সোশ্যাল মিডিয়ায়) ব্যবহার করে এবং মারাত্মক মানসিক, শারীরিক ও আচরণগত সমস্যায় ভোগে। আর এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে তার পড়ালেখায়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা উচিত এবং প্রয়োজনে অভিভাবকের সম্মতির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নাগরিকত্ব, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই, অনলাইন আচরণবিধি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে বাধ্যতামূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।


তৃতীয়ত, পরিবারে অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। সন্তানকে স্মার্টফোন দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন না রেখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার নিশ্চিত করা, কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা এবং খোলামেলা আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, প্রযুক্তি কম্পানিগুলোকেও শিশুদের জন্য নিরাপদ সংস্করণ, কনটেন্ট ফিল্টার, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ আরো কার্যকর করতে হবে। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগে ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বইপড়া, বিজ্ঞানচর্চা, স্কাউটিং এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে বেশি সম্পৃক্ত করতে পারলে তাদের অবসর সময় ইতিবাচক কাজে ব্যয় হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাইবার অপরাধ দমন সক্ষমতা বাড়ানো এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইন অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে কোনো নীতিমালা প্রণয়নের সময় শিশুদের শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি, সৃজনশীলতা ও মতপ্রকাশের অধিকার যেন অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও