ঢাকাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র থেকে বিকেন্দ্রীভূত বাংলাদেশ
বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্ধশতক অতিক্রম করেছে। এ সময়ে অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে— উন্নয়নের বেশির ভাগ সুযোগ, বিনিয়োগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সরকারি সেবার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ঢাকা। ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের বিপরীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈষম্য, জনসংখ্যার চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সেবাপ্রাপ্তির অসামঞ্জস্য ক্রমেই প্রকট হয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো কি এখন আরো বিকেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত? দেশের উন্নয়নকে আরো সুষম, অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই করতে কি প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন? এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কাঠামোগত প্রশ্ন।
বিশ্বের বহু সফল রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রাদেশিক বা অঙ্গরাজ্য সরকার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতে জাতীয় ঐক্য বজায় রেখেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের বড় অংশ প্রাদেশিক বা রাজ্য সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে উন্নয়নের সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নাগরিক সেবাও তুলনামূলকভাবে দ্রুত পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বাজেট অনুমোদন, প্রশাসনিক নিয়োগ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমতি ঢাকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। এতে একদিকে যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়, অন্যদিকে স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধানও অনেক সময় সম্ভব হয় না।
আজ ঢাকার ওপর যে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা শুধু জনসংখ্যার কারণে নয়; বরং সুযোগের কেন্দ্রীভবনের ফল। উন্নত শিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, বড় শিল্প, উচ্চ আদালত, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, উন্নত কর্মসংস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর—সব কিছুই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি কিংবা প্রশাসনিক কাজের জন্য রাজধানীতে ছুটে আসে। এতে ঢাকার যানজট, আবাসনসংকট, দূষণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাব্য সংস্কার হতে পারে— বাংলাদেশে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা। উদাহরণস্বরূপ, নীতিগত আলোচনার জন্য চারটি বৃহৎ প্রশাসনিক অঞ্চল কল্পনা করা যেতে পারে: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (খুলনা ও বরিশাল), উত্তরাঞ্চল (রাজশাহী ও রংপুর), পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা বিভাগ) এবং মধ্যাঞ্চল (ঢাকা ও ময়মনসিংহ)। এটি শুধু একটি আলোচনাযোগ্য মডেল; এর বাইরেও বিভিন্ন বিকল্প কাঠামো থাকতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতিটি প্রদেশে নির্বাচিত আইনসভা ও নির্বাহী প্রশাসন থাকলে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হতে পারে। কৃষিপ্রধান অঞ্চলে কৃষি ও সেচ, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন, পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশ ও পর্যটন, শিল্পাঞ্চলে শিল্প ও দক্ষতা উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক নীতি গ্রহণের সুযোগ বাড়বে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল হতে পারে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস। বর্তমানে রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরের তুলনায় অনেক জেলার অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্পায়ন পিছিয়ে রয়েছে। যদি প্রাদেশিক পর্যায়ে পরিকল্পনা, বাজেট ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তবে প্রত্যেক অঞ্চল নিজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তব রূপ পেতে পারে। সব সিদ্ধান্ত ঢাকায় কেন্দ্রীভূত না থেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে নেওয়া গেলে নাগরিক সেবার গতি বাড়তে পারে, জবাবদিহি শক্তিশালী হতে পারে এবং প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে পারে। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে সরকার, আইনসভা ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণও বিস্তৃত হতে পারে।
চতুর্থত, নতুন নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের বিকাশ সম্ভব। যদি প্রতিটি প্রদেশে প্রশাসনিক সদর দপ্তর, উচ্চ আদালতের আঞ্চলিক কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চল এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে ওঠে, তবে ঢাকার বাইরে একাধিক শক্তিশালী নগরকেন্দ্র তৈরি হবে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের চাপও কিছুটা কমতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজধানী
- বিকেন্দ্রীকরণ