ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাতন্ত্র্য: ইতিহাসের দ্বিপর্বকথন

বিডি নিউজ ২৪ বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৪

রাষ্ট্রের জন্ম কখনো ঘটে রাজদরবারে, কখনো সংসদের ভোটে, আবার কখনো ঘটে যুদ্ধক্ষেত্রে— যেখানে মানুষের জীবনই হয়ে ওঠে শেষ দলিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্বাধীনতা সব জাতির কাছে এক পথে আসেনি। কোথাও তা এসেছে আলোচনার টেবিলে, কোথাও এসেছে প্রশাসনিক ঘোষণায়, আবার কোথাও এসেছে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই বৈচিত্র‍্যময় ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়— কারণ এখানে স্বাধীনতা কোনো আইনগত অনুগ্রহ নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্ব।


বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যতিক্রমী অবস্থান


The sun never sets on the British Empire. ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।’ কথাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তৃতির সময়কাল, বিশেষভাবে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ২০শ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (আনুমানিক ১৮৫০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) পর্যন্ত প্রযোজ্য ছিল। এই সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ ও প্রভাব বলয় এতটাই ব্যাপক ছিল যে, বিশ্বের ২৪টি সময় অঞ্চলের যে কোন এক সময়ে সর্বদা তার কোনো না কোনো অঞ্চলে দিনের আলো থাকত। বিশ্বের বহু দেশই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে তুলনামূলক শান্ত প্রক্রিয়ায়:


ঘানা: ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্বাধীনতা (ঘানা ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট ১৯৫৭)।


নাইজেরিয়া: প্রশাসনিক হস্তান্তর (নাইজেরিয়া ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট ১৯৬০)।


শ্রীলঙ্কা: সলবুরি কমিশন ও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা (সিলন ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট ১৯৪৮)।


বার্মা/মিয়ানমার: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও বার্মিজ নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা (অং সান-অ্যাটলি চুক্তি ১৯৪৭)


অন্যদিকে কিছু দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলেও, সেগুলো ছিল প্রধানত ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে:


আলজেরিয়া (১৯৬২): ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পরিশেষে ইভিয়ান চুক্তি।


ভিয়েতনাম (১৯৫৪/১৯৭৫): ফরাসি ও পরে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।


আবার ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে ৩০ বছর যুদ্ধ করে গণভোটের মাধ্যমে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হয় (১৯৯৩) এবং দক্ষিণ সুদান দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নাইভাশা চুক্তি (২০০৫) এবং পরে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে (২০১১)। গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যানের নজিরও রয়েছে: কানাডার অঙ্গরাজ্য কুইবেক (১৯৮০ ও ১৯৯৫), যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ড (২০১৪) ও নর্দার্ন আয়াল্যান্ড (১৯৭৩)।


যাহোক, যেসব দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেগুলো চুক্তি, সাংবিধানিক আইন, রাজনৈতিক সমঝোতা ও গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে— যেখানে যুদ্ধজয়ী আত্মসমর্পণ বা সামরিক পরাজয় ছিল না; এ কারণেই এগুলো বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অভিজ্ঞতা থেকে কাঠামোগতভাবে ভিন্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনন্যতা এখানেই। এটি ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধ, যেখানে শাসক ও শাসিত একই ধর্মীয় পরিচয়ের হলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং যুদ্ধের শেষে একটি নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতার সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে। এই প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি successful secession through armed struggle হিসেবে চিহ্নিত করে— যা সংখ্যায় খুবই সীমিত।


উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান: স্বাধীনতার রূপায়ন


উপমহাদেশের মানচিত্রে তিনটি রাষ্ট্রের জন্মই বিক্ষুব্ধ সময়ের সাক্ষী, কিন্তু তাদের স্বাধীনতা অর্জনের প্রকৃতি, পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপটে রয়েছে গভীর ব্যবধান। ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা ছিল রাজনৈতিক-আইনি স্থানান্তরের ফল।


১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১০০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজশক্তি (the Crown) সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে। প্রশাসনিকভাবে ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি সরাসরি কলোনি/রাজ্য (Crown Colony বা Imperial Possession) হয়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অঞ্চলকে বলা হতো ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ (এর সঙ্গে দেশীয় রাজ্যগুলো মিলিয়ে বলা হতো ‘ভারতীয় সাম্রাজ্য’)। এর শাসক হন ব্রিটিশ রাজা/রাণী, তার প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে নিযুক্ত হন একজন ব্রিটিশ ভাইসরয় (Viceroy)। তখন থেকে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত ভারতের শাসনকাল পরিচিতি ছিল ‘ব্রিটিশ রাজ’ হিসেবে। এই ব্রিটিশ রাজের অবসান ঘটে ১৯৪৭ সালে এসে।


১৮ জুলাই, ১৯৪৭ ব্রিটিশ সংসদে ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’ (Indian Independence Act) পাশ হয়, যা একই দিনে রাজকীয় সম্মতি লাভ করে। কার্যকর হয় ১৫ই অগাস্ট, ১৯৪৭ (অধ্যায় ১, ধারা ১)। এ আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অধিরাজ্য’ (Dominion) হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানকে স্বীকৃতি প্রদান করে। অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। অধিরাজ্য হওয়ার অর্থ ব্রিটেনের রাজার আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়া, তবে তা শুধু সাংবিধানিক অর্থেই। স্বাধীন দুই দেশেই সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে থেকে যান ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জ। শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় দুই দেশের নেতৃবৃন্দের কাছে; তারা প্রশাসনিক বা নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন। রাজা দুই দেশেই একজন করে ‘গভর্নর জেনারেল’ নিয়োগ প্রদান করেন, যাদের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। ভারতে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাকিস্তানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সরাসরি পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন, অর্থাৎ স্বাধীন পাকিস্তানেও তিনি হন ব্রিটিশ রাজার প্রতিনিধি।


ভারতীয় স্বাধীনতা আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ এক (১৫ অগাস্ট) হলেও, আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের কার্যক্রমটি ২৪ ঘণ্টা ধরে (১৪-১৫ অগাস্ট) ঘটে, যা দুটি আলাদা ‘স্বাধীনতা দিবস’ তৈরি করে। ১৪ অগাস্ট, ১৯৪৭ (রাত ১১:৫৯) করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। নিজের আগ্রহে জিন্নাহ গভর্নর জেনারেল পদে শপথ গ্রহণ করেন। অপরদিকে ১৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ মধ্যরাতে দিল্লিতে ভারতীয় ‘গণপরিষদে’র অধিবেশনে মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং জওহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তার ঐতিহাসিক Tryst with Destiny ভাষণ প্রদান করেন। উভয় দেশের গণপরিষদই ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল।


পাকিস্তানে একদিন আগে ক্ষমতা হস্তান্তরের কারণ ছিল প্রথম স্বাধীন হওয়ার প্রতীকী দাবি; জিন্নাহ চেয়েছিলেন পাকিস্তানকে প্রথম স্বাধীন অধিরাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। আরেকটা অভিমত আছে যে. ইসলামিক পঞ্জিকা অনুযায়ী ২৭ রমজান (পবিত্র রাত লাইলাতুল কদর) পড়েছিল ১৪ অগাস্ট। আবার মাউন্টব্যাটেনের সময়সূচিও একটা ফ্যাক্টর ছিল; তিনি করাচিতে ১৪ অগাস্ট এবং দিল্লিতে ১৫ অগাস্ট উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৫ অগাস্ট ছিল জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী (১৯৪৫), যেখানে মাউন্টব্যাটেন ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও