
নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার গঠিত হয়, তাকেই আমরা গণতান্ত্রিক সরকার বলি। স্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয়ে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম লক্ষ করি।
আর ব্যতিক্রম তখনই ঘটে, যখন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সরকার গণতান্ত্রিক আচরণের পরিবর্তে ভিন্ন আচরণ করে কিংবা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিচালিত হয়। বিভিন্ন কারণে তা হয়ে থাকে। নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত করা কিংবা অন্য কোনো কারণে। এ রকম দুটি ঘটনা আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী।
১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি অন্তর্বর্তী সরকার পেয়েছিলাম, যে সরকারের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হতে পারে না মনে করে আমরা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিলাম, কিন্তু তা আমরা টিকিয়ে রাখতে পারিনি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবার ৩৪ বছর পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারেরও মূল লক্ষ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।
কেননা দীর্ঘদিন একটি অরাজনৈতিক সরকার থাকতে পারে না। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আমরা সবাই একই সুরে কথা বলছি না। ফলে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা কাজ করছে। প্রতিদিনকার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে কবে নির্বাচন হবে।
আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এই বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের প্রথমার্ধে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে।
আমাদের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আসন্ন ডিসেম্বরে নির্বাচনের জন্য তারা প্রস্তুত এবং সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছে। তারা কিছুদিনের মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা বলেছে। আমাদের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনের জন্য কথা বলে আসছে। তাদেরও চাওয়া ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন। অন্য একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলছে, আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন। তারা সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্য অনেক রাজনৈতিক দলও নির্বাচনের পক্ষে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি করছে। তাদের সবার বক্তব্য, সংস্কার ও নির্বাচন একই সঙ্গে চলতে পারে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার করা দরকার, ততটুকু করে যেন নির্বাচন দেওয়া হয়। নির্বাচিত সরকার বাকি সংস্কার করবে। আমাদের সেনাপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলছেন এবং তিনি তাঁর বক্তব্যে অটল। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানেও তিনি তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। জাতিসংঘ সম্প্রতি তার প্রতিবেদনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। এমনকি আমাদের সেনাপ্রধানও একই কথা বলছেন। আমাদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ নির্বাচনের আগে সংস্কারের ওপর বেশি জোর দিয়ে আসছে। তারা আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পরে সংসদ নির্বাচনের পক্ষে কথা বলছিল। সম্প্রতি রাজনৈতিক দল গঠন করার পর তাদের কেউ কেউ জোর দিয়ে বলছেন যে ফ্যাসিবাদী দোসরদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন নয়। তাঁরা দ্বিতীয় রিপাবলিক এবং গণপরিষদ নির্বাচনের ধারণা সামনে আনছেন। আর সংস্কারের কথা তো আগে থেকেই বলে আসছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের বক্তব্য থেকে আমরা বলতে পারি, নির্বাচন নিয়ে আমরা এখন পর্যন্ত এক জায়গায় বা ঐকমত্যে আসতে পারিনি, যদিও মাঠের রাজনৈতিক বক্তব্য ও আলোচনার কোনো বক্তব্য এক না-ও হতে পারে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের ‘একটি সংক্ষিপ্ত প্যাকেজ’-এ সম্মত হলে ডিসেম্বরে নির্বাচন হতে পারে। তবে দলগুলো সংস্কারের ‘একটি বৃহত্তর প্যাকেজ’-এ সম্মত হলে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক ইফতার মাহফিলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নির্বাচন যত দেরি হবে, তত বেশি বাংলাদেশের পক্ষের শক্তিকে পরাজিত করতে ফ্যাসিস্ট শক্তি মাথাচাড়া দিতে শুরু করবে। একই সঙ্গে জঙ্গি ও উগ্র মনোভাব পোষণকারীরাও এই সুযোগগুলো নেওয়ার চেষ্টা করবে।’ আরেক ইফতার মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার দরকার, ততটুকু করে নির্বাচন দিন। নির্বাচনী সংস্কার করুন। বাকি সংস্কার নির্বাচিত সরকার করবে।’