
রাজনীতি জয়যুক্ত হোক
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি। জুলাই-অগাস্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথ সুগম হবে— দেশের মানুষ এমনটাই প্রত্যাশা করেছিল।
দেশের রাজনীতিতে আরেকটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ কী মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে? নতুন এই দলে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতির মাঠে সামিল হতে ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়েছেন নাহিদ ইসলাম।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হতে যাচ্ছে, নাহিদ তাতে যোগ দিচ্ছেন। তিনিই এই দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব নেবেন বলে সংবাদমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলছে। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে আগামীতে রাজনীতির ময়দানে শুদ্ধাচারের রাজনীতির পথ কতটা সুগম হয় তা ভবিতব্য। তবে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আমাদের রাজনীতির শ্রী ফিরুক।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বহুমুখী বাহাস চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আশা ব্যক্ত হয়েছিল ডিসেম্বরের মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। আবার সরকারেরই কেউ কেউ বলছেন তা আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত গড়াতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল মহলের দিক থেকে জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের কথা উচ্চারিত হওয়ার পরপরই বিএনপি তাদের জোর আপত্তি জানিয়েছে এবং তা এখনও জারি আছে। তারা স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, কোনোভাবেই তারা এটা মানবে না। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর এ ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে। দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে জামায়াত যে অনাগ্রহী তা মোটামুটি স্পষ্ট। নতুন যে দলটি গঠিত হতে যাচ্ছে তারা এ ব্যাপারে অবস্থান কি নেবে তা অজানা। অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেওয়া ‘সম্ভব নয়’। কমিশনের মূল লক্ষ্য ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। এ নিয়ে একদিকে রাজনৈতিক মতবিরোধ অন্যদিকে সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান এবং সংবিধান অনুসারে নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনার মধ্যে বিস্তর ফারাক দৃশ্যমান। বাড়ছে রাজনৈতিক বাহাস।
এখন প্রশ্ন হলো, গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে শ্রীহীন রাজনীতির অপবাদ ঘোচানোর যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তা কি ফিকে হয়ে যাবে? নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের প্রেক্ষাপট আর জুলাই-অগাস্টে সৃষ্ট প্রেক্ষাপট এক নয়। শেখ হাসিনার সরকার পতনের গণবিস্ফোরণের চেহারায়ও পার্থক্য অনেক। ধারণা করি, নতুন দলটি গঠনের পর নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চিত্রও বদলে যাবে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নতুন দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণে তাদের প্রস্তুতির জন্য সময় নেয়ার চেষ্টা করবে, মোটাদাগে তা বলা যায়। অর্থাৎ নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে অনেক ‘যদি’, ‘কিন্তু’র একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুও ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র জালে জড়িয়ে যেতে পারে। রাজনীতির শ্রী ফিরে পাওয়ার জনপ্রত্যাশাও হোঁচট খেতে পারে।
লেখাটির শিরোনাম অনেকের মনেই প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। নির্বাচনে প্রার্থীর জয়-পরাজয় আছে, কিন্তু রাজনীতির কি জয়-পরাজয় আছে? রাজনীতি যেহেতু আদর্শের ভিত্তিভূমি এবং রাজনীতিবিদ পরিচয়ধারীরা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন, সেহেতু জয়-পরাজয়ের বিষয়টি মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতেই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন কদাচারের চারণভূমি হয়ে উঠবে তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত কিংবা চিন্তনীয় ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা-ই হয়েছিল। কেন ও কীভাবে হয়েছিল এর প্রেক্ষাপটও সচেতন মানুষমাত্রই জানেন।
অভিজ্ঞতায় আছে, নির্বাচনের সময় জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়। সার্বিক প্রেক্ষাপটে এক ধরনের অনিশ্চয়তা-কৌতূহলের ছায়া পড়ে। প্রার্থীদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি নিয়ে নানা কথাও হয়। পাশাপাশি এতে আরও অনেক কিছুর সংযোজনও ঘটে। গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন উৎসব হিসেবে পরিগণিত হওয়ার নজির বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই আছে। আমাদের দেশেও যে এমন নজির নেই তা তো নয়। কিন্তু আমাদের ভোটপর্ব ওই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল কীভাবে এও তো অজানা নয়। নির্বাচন কিংবা ভোট মানেই সহিংসতার প্রলম্বিত ছায়ার নিচে জনগণের বসবাসের ক্ষেত্র যা অতীতে তৈরি হয়েছে বারবার।
কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্বের লড়াই চলছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিলম্বে হলেও বলছি, এমন বক্তব্য যুক্তিযুক্ত নয়। রাজনীতিতে আদর্শিক বিভেদ থাকবে এবং গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মোটেও তা অসিদ্ধ নয়। কিন্তু এই বিভেদকে কেন্দ্র করে ভোটের আমেজ কিংবা উৎসবের অপমৃত্যু, একইসঙ্গে জননিরাপত্তাহীনতার উৎকট রূপ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অনাচারী কর্মকাণ্ডও কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখছি, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকের অনেকেই উচ্চারণে গণতন্ত্রের ‘বুলি’ আওড়ান কিন্তু আচরণে বৈরিতার ছায়াই ছড়ান। অনেকেরই হয়তো এও স্মরণে আছে, বিশেষ ব্যবস্থায় (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র অভিযোগ উঠেছিল। কেন এ ধরনের বিশেষ ব্যবস্থায় নির্বাচনের পথ সৃষ্টি হয়েছিল? সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন অবিতর্কিত নির্বাচন করার যোগ্যতা, দক্ষতা ও নির্মোহ অবস্থান অর্থাৎ নিরপেক্ষতা হারিয়েছিল তখনই এমন চিন্তার উদ্ভব ঘটে এবং পরে তা আবার বাতিলও হয়।