ছবি সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং বিতর্ক

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৩৬
আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৩৬

উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার মধ্যে অন্যতম একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ভর্তি হতে আসা এবং পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা 'র‌্যাগ' নামক এক অত্যাচারের জন্য ভয়ে থাকে। আতঙ্কে কাটে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। সম্প্রতি জাবির প্রথম বর্ষের একটি মেয়ের সাথে তার সিনিয়র আপুরা র‌্যাগিং এর নামে নানা অশ্লীল ও অকথ্য ভাষায় আচরণ করে। একটি অনলাইন পত্রিকায় তা নিয়ে জাবি উপাচার্য বরাবর খোলা চিঠিও প্রকাশ হয়। এটা নিয়ে ব্লগ ও ফেসবুকে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর টনক নড়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। প্রশাসন ও জাবির শিক্ষার্থীরা এই বিষয়টাকে ভুয়া বলে দাবি করে। তারা বলেন, আগে এই ধরণের ঘটনা ঘটলেও এখন আর এমন কিছু নেই। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা বলেন, র‌্যাগিং বলে কিছু নেই। কিন্তু ব্লগে ও ফেসবুকে জাবির র‌্যাগিং নিয়ে বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন অনেকে। ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়া একজন নবীন শিক্ষার্থীর মাঝে এসব র‌্যাগের প্রতিবাদ করার সাহস না থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রতিবাদ করলে সিনিয়ররা হাত তুলতেও দ্বিধা করেন না বলে জানিয়েছে তারা। আর জাবির সম্মান রক্ষার্থে সেখানকার শিক্ষার্থীরা এসব অস্বীকার করবে এটাও যেমন স্বাভাবিক তেমনি র‌্যাগের শিকার শিক্ষার্থীরাও ভয়ে চুপ হয়ে যাবে। জাবির র‌্যাগিং নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানান কথা হয়েছে। তার থেকে কিছু কিছু মন্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। ফেসবুকে Mahbub Hasan লিখেছেন: মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে। অক্ষমতায় সমস্ত হাত পা কাপছে। আমি নিশ্চিত স্ট্যাটাস টি পড়ার পরে আপনার মাথার মধ্যেও আগুন ধরে যাবে। ফ্রেন্ডলিস্টের সবার দৃষ্টি আকর্ষন করছি। ফেসবুকের এক ভাই একটু আগে মেসেজ দিলেন। পুরো মেসেজ টা এখানে তুলে দিচ্ছিঃ "ভাই, আপনার কাছে একটা হেল্প চাই। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে আমার এক বোন (কাজিন) আজ প্রথম ক্লাস করতে গেছে, আইটি ডিপার্টমেন্টে, ফার্স্ট ইয়ার। ভাই! বোনটা আমার সারাদিন কাঁদল, কাঁদল আমার খালা... কিছুই করতে পারলাম না ভাই! ও জাহানারা হলে থাকে। ওর ডিপার্টমেন্টের বড় আপুরা ওকে ডেকে শারিরীক এবং মানসিকভাবে লাঞ্চিত করে আধমরা করে দিয়েছে। ওর বড় আপুরা ওকে বলেছে ক্লাসের বড় ভাইদের কাছে গিয়ে তোমার ব্রেস্টের মাপ দিয়ে আসো...ভাই! সব বলতে পারছিনা। কাল ঐ বড় আপুরা সবাইকেই হলে থাকতে বলেছে, হল ছাড়া যাবেনা। আজ নাকি ওরা কেবল মাংস "ধুইছে", কাল "কশাবে"! ভাই, আমাদের প্রভাবশালী কোনো মামা/খালু নেই। আপনি তো ব্লগে লিখেন, এত বড় একটা গ্রুপ চালান- আপনি চাইলে হয়ত কিছু করতেও পারেন। আপনার ও বোন আছে, দয়া করে একজন ভাই হিসাবে একটু হেল্প করেন ভাই..." ক্লাসের প্রথমদিন নতুনদের উপর র‍্যাগিং নতুন কিছু নয়। প্রথমে র‍্যাগিং দিয়ে শুরু হলেও পরে ভার্সিটির বড় ভাই/নেতাদের মনোরঞ্জনে শরীরটাও বিকিয়ে দিতে হয় টিকে থাকতে হলে। খবরের কাগজে/ব্লগে এগুলো নিয়ে পড়তে পড়তে অনেকের কাছে হয়ত ডাল-ভাতের মত হয়ে গেছে ব্যাপার টা। কিন্তু মনে রাখুন- আজ অন্য কারো বোন লাঞ্ছিত হচ্ছে, কাল হতে পারে আপনার বোন/আত্নীয় টিও। ফ্রেন্ডলিস্টের সবার কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যে যেভাবে পারেন প্লীজ হেল্প করেন! আপনাদের ফ্রেন্ডলিস্টে জাহানীরনগর ইউনিভার্সিটির কেউ থাকলে প্লীজ এগিয়ে আসুন। আগামীকাল ঐ বোনটির লাঞ্ছিত হওয়া যেভাবে পারেন বন্ধ করেন। আর একটি মেয়েও যেন লাঞ্ছিত না হয়, আর একটি মেয়ের স্বপ্ন যেন অঙ্কুরেই শেষ না হয়ে যায়। এরপরই ফেসবুক ও ব্লগে তোলপাড় শুরু হয়। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্ট্যাটাসটি শেয়ার হয়েছে ৯৭৫ বার। এর আগে বিভিন্ন সময় জাবির র‌্যাগিং নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। যদিও এই ঘটনাটি আসেনি একটি অনলাইন ছাড়া আর কোথাও। প্রতিবাদে জাবির সাবেক এক শিক্ষার্থী Epon Shamsul লিখেছেন : "আমার ঘরের কথা আমিই জানিনা! জানেন পাশের পাড়ার আব্দুল এ!!!" গতকাল একটা পোস্ট অনেক ওয়ালে ঝুলতে দেখা গেল। মধ্যরাত পার হবার পরের ঘটনা। সেখানে সজল নামধারী একজনের ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না (লিখিত রূপ) শুনতে পেলাম। তার কোন এক বোনকে নাকি জা.বি তে র্যাকগ দেয়া হয়েছে। সেই র্যাকগের ধাক্কায় মেয়ে আধমরা। সে(সজল) এখন বিভিন্ন পেইজের এডমিনের কাছে সাহয্য ভিক্ষা করছে, তার বোনকে বাঁচানোর জন্য। সেই পোস্টে আরও ইঙ্গিত করা হয়েছে- "জা.বি তে মেয়েদের টিকে থাকতে হলে নাকি শরীর বিকিয়ে দিতে হয়।" এ প্রসঙ্গে বলছি, আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী। আমি যাদের রুমমেট হিসেবে পেয়েছি তাদের মাঝে ৩ জন শিক্ষকতা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরো ৭ জন বন্ধু-বান্ধবী, ছোট ভাইও আছে শিক্ষকতায়। তাদের কারো সাথেই মুঠোফোন বা সরাসরি যোগাযোগ করিনি। আপনাদের বলছি, ওনাদের কেউই সত্য প্রকাশে পিছপা হবেন না। আমি তা মনে প্রানে মানি এবং সে বিশ্বাস এখনো অটুটই আছে। তবুও তাদের কারো সাথেই যোগাযোগ করে ব্যাপারটি জানতে চাইলাম না! আমি ছাত্রদের কাছে জানতে চেয়েছি। জানতে চেয়েছি যারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে-পাশের এলাকার বাসিন্দা। যে ব্যাচের/ডিপার্টমেন্টের মেয়েটার সাথে র্যাকগের নামে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে, আমি কথা বলেছি তাদের সাথেও। তারা ঘটনার সত্যতা পায়নি! জাহানারা হলে আমার বোন থাকে। ওকে বলেছি নিবিড় ভাবে আবারো খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাতে। সেও এই ঘটনার কোন সত্যতা পায়নি!! "সজল" নামধারী একজন বানোয়াট ঘটনা ছড়াল, আর আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম!!! একটা ঘটনা/ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবার আগে ভাবা এবং যাছাই করা উচিত। র‌্যাগিং নিয়ে অনলাইন পত্রিকাটির নিউজলিংক : ‘... বাচ্চা, বেয়াদব, বলার পরে সালাম দেস। তোর...।’ মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় ভাবতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মানেই অনেক জ্ঞানী, আচার আচরণে তার ছাপ পড়ে। কিন্তু এদের কথায় তার কোনো ছাপ নেই। মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট হিংস্র প্রাণী এরা। বিস্তারিত : http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=82ee6eb450f9adf5d63aa478710e92a5&nttl=30012013169846 তবে বন্ধু শরীফের কাহিনীগুলো আরো নির্মম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা তাকে একটি সিগারেট এক মিনিটে টেনে শেষ করতে বলে। যথারীতি শরীফ তা পারেনি। কোনো রকমে মোরগ লড়াইয়ের খেলা দেখিয়ে সে যাত্রায় রেহায় পায়। বিস্তারিত : http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=9324d279b07bdbd400687c9c8e097116&nttl=30012013169862 আমার সাহসে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে চারজন মিলে জোর করে ভাসানী হলের পুকুরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আমি পুকুরে পড়ার পর পায়ে আঘাত পাই। সে ব্যথা ও পায়ের ক্ষতের দাগ এখনও আছে। পুকুর থেকে মামা আমাকে তুলে আনেন। বিস্তারিত : http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=d6011509eff8fb75f074ee1839a9d93a&nttl=30012013169916 আবার এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবাদ পাঠায় এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায় সব পত্রিকায়। অন্যদিকে র‌্যাগিং এর বিপক্ষে জাবি শিক্ষার্থীর লেখা মতামত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একজন বর্তমান ছাত্র আমি। গতকাল রাতেই যখন এই খবর শুনতে পাই সাথে সাথেই খবরের সত্যতা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি। এবং আজ সকাল ১০ টা থেকে স্বশরীরে ক্যাম্পাসে থেকে এর সত্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছি। এবং জেনেছি এটি একটি গুজব। অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং এটি যে একটি গুজব তাঁর প্রমাণ নিচে দিচ্ছি— বিস্তারিত : http://www.poriborton.com/article_details.php?article_id=10588 একটি দৈনিক পত্রিকার চিত্রিপত্র কলামে লেখা জাবি শিক্ষার্থীর একটা চিঠি। যাতে র‌্যাগের বিপক্ষে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং র‌্যাগ বন্ধের আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে বলেছে। কিছু দিন আগে নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অজুহাতে তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ নানাভাবে হয়রানি করে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। নতুন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এলে তাদের আগে বড় ভাইদের সঙ্গে পরিচয় হতে হয় আর সে সময় তারা ভয়ঙ্করভাবে র‌্যাগ দিয়ে থাকে। ক্যাম্পাসের এই ভয়ঙ্কর পরিচয় পদ্ধতির নাম র‌্যাগিং বিস্তারিত : http://www.samakal.com.bd/details.php?news=42&view=archiev&y=2012&m=01&d=07&action=main&menu_type=&option=single&news_id=223680&pub_no=924&type= চলছে নীরব র‌্যাগিং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে সিনিয়র ভাই-আপুদের দ্বারা নিয়মিত র্যাগিং দেয়া হচ্ছে বিস্তারিত: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/01/29/185164 র‌্যাগিং এর বিরুদ্ধে জাবিতে বিক্ষোভ মিছিল : র‌্যাগিং বন্ধসহ তিন দফা দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিক্ষোভ মিছিল ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাবি শাখার নেতা-কর্মীরা http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=f2ca287301d52da7bf4f9b3851691476&nttl=30012013169997 র‌্যাগিং না থাকলে বর্তমান শিক্ষার্থীরা কীভাবে প্রতিবাদ করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এর বিরুদ্ধে একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। উপরের ছবিটি সেই সাইনবোর্ডের। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা এবং অনলাইন মিডিয়াতেও এই বিষয়ে লেখালেখি হয়েছে। তা থেকে নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং-এর অস্তিত্ব রয়েছে। যেই খবরটির উপর ভিত্তি করে পুরো জাহাঙ্গীরনগর কেঁপে উঠেছে, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু, এই ধরনের একটি প্রক্রিয়ার কথা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অসুস্থ্য কর্মকান্ড এতটা বাড়লো কিভাবে? এর সঠিক উত্তর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাই ভালো দিতে পারবেন।