‘ডোল’ রাজনীতি ও মোদির কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক
পক্ষকাল অতিবাহিত। এখনো পূর্ণ মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়নি। কিন্তু কালক্ষেপণ না করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির নীতি রূপায়ণে মন দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে বিজেপির সরকার। অন্য সবার চেয়ে তাঁরা যে আলাদা, সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠার তাগিদে শুভেন্দু হাঁটা শুরু করেছেন। কোনো কোনো সিদ্ধান্ত ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করলেও তিনি ভ্রুক্ষেপহীন। বিপুল জয়ে গদিয়ান তিনি। কে কী ভাববে, কার কী প্রতিক্রিয়া, সেসব বিবেচনার সময় এখনো আসেনি।
এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রকৃত অর্থে ‘তৃণমূল কংগ্রেস বনাম ভারত রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছিল কি না, এসআইআরের নামে প্রায় ১ কোটি নাম ছাঁটাই ও ২৭ লাখের ভোটাধিকার হরণ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুপরিকল্পিত ছক ছিল কি না, কিংবা সুপ্রিম কোর্ট কতটা নিরপেক্ষ থেকেছেন—এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে রায় দিয়েছে, এটাই সত্য। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইস্তফা’ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিংবা জোর করে হারানোর অভিযোগ নিষ্ফলা হাহাকার। তাঁদের বরং উচিত আত্মবিশ্লেষণে নিবিষ্ট হওয়া। মানুষ কেন পরিবর্তন চাইছিল অনুধাবন করা। ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোঁজা।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রায়ই বলতেন, যে উঠছে তাকে একটু ঠেলা দিলে আরও কিছুটা তোলা যায়। যে নামছে তাকে একটু ঠেলা মারলে খানিকটা নামানোও যায়। কিন্তু যে উঠছে তাকে নামানো কিংবা যে নামছে তাকে ওঠানো কঠিন। তৃণমূল কংগ্রেস নামছিলই। প্রতিপক্ষের ঠেলা তাকে অসম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে এই যা।
বিজেপির বঙ্গ জয় সেই অর্থে প্রত্যাশিতই। মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও রোষ দেখেছি। অবাঙালি সমাজের অসম্ভব মোদি-মুগ্ধতাও দেখেছি। তৃণমূল নেতারাও তা অনুধাবন করেছিলেন। যদিও ভেবেছিলেন, নারী ও মুসলমান ভোট তরিয়ে দেবে। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গ যে এভাবে পথে বসাবে, তা তাঁরা কল্পনা করেননি। শিক্ষিত সুভদ্র বাঙালি ও অবাঙালি জনগোষ্ঠী মুখ ফিরিয়েছে, নারী ও মুসলমান ভোটও জমাট বরফ হয়ে থাকেনি। তৃণমূল নামছিলই। বিজেপি-ইসির বাড়তি ঠেলা আরও নামিয়েছে।
পাঁচ রাজ্যের ভোটের মধ্যে অপ্রত্যাশিত ফল শুধু তামিলনাড়ুতে। ছয় দশকের ট্র্যাডিশন ভেঙে দুই দ্রাবিড়ীয় দলকে পথে বসিয়েছে এক অদ্রাবিড়ীয় শক্তি। দুই বছর আগে যে দলের জন্ম, তারা এভাবে নেপো সেজে দই মেরে দেবে, কল্পনার অতীত ছিল। ঠিকঠাক সমীক্ষা করেছিলেন একজনই। ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’র প্রদীপ গুপ্ত, যিনি স্যাম্পেল কম হওয়ার দরুন পশ্চিমবঙ্গের বুথফেরত সমীক্ষার ফল জানাননি।
প্রদীপই বলেছিলেন, যোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে ৯৮-১২০টি আসন পাবে। কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, স্থানীয় দল ভিসিকে ও বামপন্থীদের সাহায্যে ১২০ জনের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়েন বিজয়। আস্থা ভোটে এআইএডিএমকের ভাঙন ও ২৫ জনের সমর্থন তাঁর বাড়তি পাওনা। ঘাড়ের ওপর ঝুলে থাকা খাঁড়াটা সরে গেছে। শুরু হয়েছে তামিল রাজনীতির নতুন অধ্যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মন্ত্রিপরিষদ
- বিধানসভা নির্বাচন