কপ ৩১: জলবায়ু প্রতিশ্রুতির আরেকটি স্তর, নাকি বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়
তিন দশকের জলবায়ু সম্মেলনের মঞ্চে প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতির পাহাড় ক্রমেই উঁচু হয়েছে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ, জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি কতটা হয়েছে? তুরস্কের আনাতোলিয়ায় আসন্ন কপ থার্টি ওয়ান কি সেই ব্যবধান কমাতে পারবে?
পৃথিবীকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি যত দীর্ঘ হচ্ছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার সময় তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বনেতারা জলবায়ু সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন, ঘোষণা করছেন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, গঠন করছেন তহবিল এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন কার্বন নিঃসরণ কমানোর। অথচ পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নতুন প্রতিশ্রুতি কি সত্যিই পরিবর্তন আনছে, নাকি প্রতিটি সম্মেলন আগের অসম্পূর্ণ অঙ্গীকারের ওপর আরেকটি স্তর যুক্ত করছে?
৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন, কপ থার্টি ওয়ান। তুরস্ক সভাপতিত্ব করবে আর অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিক আলোচনার নেতৃত্ব দেবে। এবারের সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য হলো, নতুন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা। কিন্তু এই প্রত্যাশার যৌক্তিকতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে জলবায়ু কূটনীতির দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে।
১৯৯২–২০১৫: রিও থেকে প্যারিস, জলবায়ু অঙ্গীকারের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৯২ সালের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদের মাধ্যমে। এর মূল দর্শন ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা হলেও সব দেশের ঐতিহাসিক দায় ও সক্ষমতা সমান নয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম কপ অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকল উন্নত দেশগুলোর জন্য নির্গমন হ্রাসের বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও সীমিত অংশগ্রহণ ও বাস্তবায়নগত দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে তা যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহের লক্ষ্য ঘোষণা করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) হিসাব মতে, ২০২২ সালে প্রথমবার তা অতিক্রম করে অর্থায়ন ১১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বিলম্ব জলবায়ু আলোচনায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি জলবায়ু কূটনীতিতে ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করে। এতে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। দেশগুলো পাঁচ বছর অন্তর নিজেদের জাতীয় নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি আরও উচ্চাভিলাষী করার অঙ্গীকার করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জলবায়ু সঙ্কট
- কপ সম্মেলন