পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশ কেন শেষের দিক থেকে তৃতীয়
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) ২০২৬ প্রকাশ করেছে। এই পরিবেশ সূচক অনুসারে বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষায় সাফল্যের দিক থেকে ১৭৭টি দেশের মধ্যে ১৭৫তম।
এবারের সার্বিক স্কোর ২৩.৩৬। ২০২৪ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১৭৫তম। তখন সার্বিক স্কোর ছিল ২৮.৪৬। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে গত দুই বছরে জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। গবেষকদের দাবি, এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পরিবেশ চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে এবারের বিশ্লেষণ আরো নিখুঁত হয়েছে।
২০২১ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর কমপক্ষে ৬.৮ বছর করে আয়ু কমে যাচ্ছে। একটি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকে শীতকালে এবং অস্বাস্থ্যকর হলেও বর্ষাকালে দূষণ একটু কম থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়। এসব বায়ুদূষণের কারণে মূলত স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগ, শ্বাসযন্ত্রের নানা রকম সংক্রমণ হতে পারে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুর দেশের সবচেয়ে দূষিত জেলা। এখানকার মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে ৮.৩ বছর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেকটি তথ্য মতে, প্রতিবছর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রতিবছর মারা যায় ৮০ হাজার মানুষ। এতে বাড়ছে বিষণ্নতা। বায়ুদূষণের কারণে জিডিপির ৪ শতাংশেরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস সময় পর্যন্ত দূষণের মাত্রা এত বেশি থাকে, যা সারা বছরের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আরো একটি তথ্য মতে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণজনিত সমস্যায় ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা গেছে।
স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিটি ফান্ডিং ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর গুণগত মান উন্নয়নের তহবিল প্রাপ্তিতে তৃতীয় ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে আর জানানো হয়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর মান উন্নয়নে বাংলাদেশ ২.৪ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। ক্লিন এয়ার ফান্ডের একটি তথ্য মতে, স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিটি ফান্ডিং ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর গুণগত মান উন্নয়নের তহবিল প্রাপ্তিতে তৃতীয় ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ বায়ুদূষণ মোকাবেলায় তেমন একটি অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো বাতাসে পিএম বা অতি ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি। কোনো স্থানের বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে সেই বাতাসকে ভালো বাতাস বলা যায়। ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে মধ্যম, আর ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকলে বিপৎসীমার মধ্যে আছে বলে ধরা হয়। ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকলে অস্বাস্থ্যকর, আর ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বায়ুমান ৩০১ থেকে ৫০০-এর মধ্যে হলে তা বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ কারণগুলো হলো—নির্মাণকাজ থেকে বায়ুদূষণ, ইটভাটা ও শিল্প-কারখানা থেকে বায়ুদূষণ, যানবাহন থেকে বায়ুদূষণ, বর্জ্য পোড়ানো থেকে বায়ুদূষণ ইত্যাদি। রাস্তাঘাট ও ভবন নির্মাণের সময় ধুলাবালি বাতাসে মিশে বাতাস দূষিত করে। নির্মাণের সময় সঠিক নিয়মে নির্মাণ করা হয় না বলে দূষণ বাড়তে থাকে। ইটভাটা থেকেও প্রচুর ছাই তৈরি হয়। এ ছাড়া ইটভাটা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সালফার অক্সাইড বাতাসে মিশে বাতাসকে দূষিত করে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে বাতাস দূষিত হয়। এ ছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমেও বাতাস দূষিত হচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের অবস্থান
- পরিবেশ
- সূচক