মিডিয়া ট্রায়াল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালের অ্যালগরিদমিক জনবিচার
একসময় জনমত তৈরি করতো সংবাদপত্র ও টেলিভিশন। কোনো আলোচিত মামলায় সংবাদ শিরোনাম, ছবি, টকশো কিংবা টেলিভিশন কাভারেজ আদালতের রায়ের আগেই একজন অভিযুক্তকে জনসমক্ষে ‘অপরাধী’ বা ‘নির্দোষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারত। এই প্রবণতাকেই বলা হয় মিডিয়া ট্রায়াল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণের পর সেই ক্ষমতা আর কেবল সাংবাদিক বা সম্পাদকদের হাতে নেই। এখন একটি ভিডিও, পোস্ট, মন্তব্য কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আর এর পেছনে কাজ করছে এমন এক অদৃশ্য ব্যবস্থা-অ্যালগরিদম, যা আমাদের দেখায় আমরা কী দেখতে চাই, কিংবা কখনো কখনো তারও আগে-কী দেখলে আমরা সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাব।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘মিডিয়া কি আদালতের আগে রায় দিচ্ছে?’ নয়। প্রশ্ন আরও গভীর, ‘আমরা কি এমন এক অ্যালগরিদমিক জনবিচারের যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে আদালতের রায়ের আগেই নিউজফিড একজন মানুষকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলতে পারে?’
‘মিডিয়া ট্রায়াল’ কী, আর আদালতবিহীন বিচার কেন আকর্ষণীয়?
মিডিয়া ট্রায়াল বলতে বোঝায় এমন পরিস্থিতি, যেখানে সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অন্যান্য সংবাদমাধ্যম কোনো বিচারাধীন বা সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে আদালতের রায়ের আগেই জনমনে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধী বা নির্দোষ হওয়ার ধারণা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ আদালত যেখানে প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেয়, মিডিয়া ট্রায়াল সেখানে অনেক সময় বর্ণনা, শিরোনাম, ছবি, সাক্ষাৎকার ও আবেগের ভিত্তিতে জনমত তৈরি করে। এই কারণেই ভারতের আইন কমিশন ২০০৬ সালে ‘Trial by Media: Free Speech Vs. Fair Trial’ নিয়ে পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল (ল কমিশন অব ইন্ডিয়া)। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনো মামলার সংবাদ প্রকাশ করাই মিডিয়া ট্রায়াল।
একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো আদালতের কার্যক্রম, অভিযোগ, প্রমাণ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে জানানো। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন অভিযোগকে সত্য হিসেবে, সন্দেহকে প্রমাণ হিসেবে এবং জনরোষকে বিচারের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এখান থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, এই ধারণা কবে থেকে আমাদের সঙ্গে আছে?
‘এটা তো নতুন কিছু নয়’-মিডিয়া ট্রায়ালের শিকড় কত পুরোনো?
জনমত দিয়ে বিচার করার প্রবণতা মুদ্রণযন্ত্রের যুগ পর্যন্ত পিছিয়ে নেওয়া যায়। তবে আধুনিক গণমাধ্যমের ইতিহাসে ‘Trial by Television’ ধারণাটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ টেলিভিশন অনুষ্ঠান The Frost Programme-কে ঘিরে।
ওই অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ডেভিড ফ্রস্ট বীমা-প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত এমিল সাভুন্দ্রা-কে তীব্রভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অনুষ্ঠানটি প্রচারের পর সাক্ষাৎকারটিকে ‘trial by television’ হিসেবে সমালোচনা করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাভুন্দ্রার ন্যায্য বিচারের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয় (Jeffries, 2013)।
এই ইতিহাসের তাৎপর্য হলো, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মানুষের বিচার করার আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। সংবাদপত্রের যুগে একজন সম্পাদক ঠিক করতেন কোন ঘটনা কতটা গুরুত্ব পাবে; টেলিভিশনের যুগে সম্পাদক ও প্রযোজক ঠিক করতেন কোন ছবি ও বক্তব্য দর্শকের সামনে যাবে। কিন্তু ইন্টারনেট সেই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ অনেকটা ভেঙে দিলো। ফলে পরের ধাপে এসে প্রশ্নটি আর শুধু ‘মিডিয়া কী দেখাচ্ছে?’ থাকল না; প্রশ্ন হলো, ‘আমরা সবাই কী দেখছি, কী শেয়ার করছি এবং একে অপরকে কী দেখাচ্ছি?’
- ট্যাগ:
- মতামত
- মিডিয়া ট্রায়াল