শব্দের বারুদ ও তরুণ মানস: ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র মনস্তত্ত্ব
চব্বিশের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ থেকে ছাব্বিশের ‘ফার্মের মুরগি’—ক্ষমতার ভাষা যখন প্রায় অভিন্ন রয়ে যায়, তা তরুণদের আত্মসম্মানে আঘাত করে, তখন রাজপথ আর অনলাইন এক হয়ে যায়। শিক্ষামন্ত্রীর ভুল স্বীকার পক্ষান্তরে ক্ষমা প্রার্থনা কি পারবে এই ক্ষোভের আগুন নেভাতে, নাকি সংকটের শিকড় আরও গভীরে?
রাজনীতিবিদদের ভাষা যখন সংবেদনশীল তরুণদের ইগোতে আঘাত করে, তখন মেসেঞ্জারে টেক্সট পাঠতে ন্যানো সেকেন্ডের মতো যতটুকু সময় লাগে ঠিক ততোখানি দ্রুততায় সংগঠিত হয়ে আজকের কিশোর-তরুণরা গড়ে তুলতে পারে প্রতিরোধের প্রবল ঝড়। বন্যার হাঁটুজল ঠেলে পরীক্ষা দিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের 'ফার্মের মুরগি' সম্বোধন করা এবং তার বিপরীতে অনলাইন-অফলাইনে গড়ে ওঠা 'ব্রয়লার চিকেন পার্টি' থেমে যায়নি, ১৫ জুলাই পরীক্ষার পর আবারও ঢাকায় অবরোধ করে ওরা প্রমাণ দিয়েছে।
রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার এবং ভাষার ভেতরের অন্তর্নিহিত রাজনীতি—দুটোই যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিবেচনাহীন যে কোনো অসতর্ক শব্দ, অথবা কোন হালকা মন্তব্য কিংবা রূপক অর্থে ব্যবহৃত অবজ্ঞাসূচক সামান্য শব্দও কীভাবে স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তার প্রমাণ আমরা ইতিহাসে বারবার দেখেছি। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঠাট্টাচ্ছলে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন, তখন তরুণ প্রজন্ম তার ভেতরে এক চরম অবমাননাকর রাজনীতি দেখতে পেয়েছিল। সেই শব্দ কীভাবে বারুদের মতো জ্বলে উঠে পুরো শাসন ব্যবস্থাকে তচনছ করে দিয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্ভাগ্যবশত, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার যে চিরন্তন রাজনৈতিক অসুখ, তার নতুন শিকার হলেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এক বিশাল অংশ যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত, বন্যার হাঁটুজল ঠেলে যখন ১৮-১৯ বছরের তরুণ শিক্ষার্থীরা চরম প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন অভিভাবকসুলভ সহানুভূতির বদলে শিক্ষামন্ত্রী অসাবধানতাবশত উচ্চারণ করলেন, অসংবেদনশীল একখানা শব্দ—‘ফার্মের মুরগি’। যদিও পরে দেখলাম কেউ কেউ বলছেন, মন্ত্রী মহোদয় নিজের কন্যাকে উদ্দেশ্য করে ‘ফার্মের মুরগি’ বলেছিলেন। এই ব্যাখ্যা যে তরুণরা গ্রহণ করেনি, বলাবাহুল্য। যদি সত্যি তা হয়েছে, তবু প্রশ্ন থেকে যায়—১৯ বছর বয়সী একজন প্রাপ্তবয়স্ক, আত্মসচেতন কন্যা বা তরুণীকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলা কতটা সঙ্গত ?
‘ফার্মের মুরগি’ কথাটার প্রভাব কতখানি গভীর হতে পারে, তা বুঝতে হলে আমাদের অল্পবয়সীদের মনস্তত্ত্বকে বুঝতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীর কথাটি কেবল একটি সাধারণ গালি বা কৌতুক ছিল না; শব্দটা মূলত তরুণদের ‘ইগো’ বা অহংবোধে সরাসরি আঘাত হেনেছে। পরীক্ষার্থীদের ওই পরিস্থিতিতে এ ধরণের শব্দচয়ন রীতিমতো ওদের সামনে প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে—‘তোমরা কিছু পারো না, তোমরা অল্পতেই কাতর, তোমরা প্রতিকূলতা জয় করার অযোগ্য।’
তরুণ ও কিশোর মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে সহজে মেনে নিতে পারে না। গভীর মানসে পরীক্ষার্থীদের ভেতর যে বোধটা কাজ করেছে তা হলো—রাষ্ট্র ও তার দায়িত্বশীলদের দেখিয়ে দিতে হবে তারা ‘ফার্মের মুরগি’ নয়, তারা লড়তে জানে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আমরা দেখলাম গত ১৪ জুলাই। ক্ষোভে ফেটে পড়া শিক্ষার্থীরা ঢলের মতো রাজপথে নেমে এল। পরীক্ষা শেষ হতেই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে তারা বাড়ির পথ না ধরে দল বেঁধে অবস্থান নিল রাজপথে। হাঁটু সমান নোংরা জল মাড়িয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার যে কষ্ট আর অপমান তারা মুখ বুজে সহ্য করেছিল, 'ফার্মের মুরগি' সম্বোধনের পর তা এক মুহূর্তেই অগ্নিগর্ভ ক্ষোভে রূপ নিল। তরুণেরা বুঝিয়ে দিল, অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ওরা কোন কিছু ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিতর্কিত মন্তব্য