তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণে কোন পথে যাবে আমেরিকা
১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৮৭। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকার শাসনতন্ত্র প্রশ্নে জাতীয় সম্মেলন। ঠিক কী চরিত্র হবে নতুন দেশটির—রাজতন্ত্র ফিরে আসবে, নাকি এক নতুন ধরনের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবে?
১১৫ দিনের তর্ক-বিতর্ক শেষে সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তাঁকে ঘিরে ধরল অপেক্ষমাণ দর্শকেরা। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডক্টর, কী ঠিক হলো?’
বেন ফ্রাঙ্কলিনের জবাব, ‘প্রজাতন্ত্র, তবে যদি আপনারা একে রক্ষা করতে পারেন।’
৪ জুলাই ২০২৬, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। ফ্রাঙ্কলিনের সেই সতর্কবার্তা এখন আগের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক অর্থবহ।
এই আড়াই শ বছরে আমেরিকা অনেক চড়াই-উতরাই দিয়ে গেছে। গৃহযুদ্ধ, নাগরিক অধিকারের লড়াই, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ৯/১১, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ।
কিন্তু কখনোই এই দেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক হিসেবে টিকে থাকবে কি না, এমন কোনো সন্দেহ জাগেনি। এখন জাগছে, কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প যেভাবে দেশ শাসন করতে চাইছেন, অনেকে তাকে রাজতান্ত্রিক বা ‘ইম্পেরিয়াল’ নামে অভিহিত করেছেন।
ফরাসি সম্রাট ১৪তম লুই বলেছিলেন তিনিই রাষ্ট্র। অর্থাৎ তিনি যা বলবেন, তা–ই আইন। ট্রাম্প ঠিক তা–ই চাইছেন। কোনো আইন, কোনো প্রচলিত নিয়ম নয়, নিজের কাছে যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই আইন, এ তাঁর নিজের কথা।
এমন ঘটতে পারে, সে বিপদ বিষয়ে ১৯৭৩ সালে সাবধান করেছিলেন ঐতিহাসিক আর্থার স্লেসিঞ্জার। তিনি এই ভেবে ভীত ছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ক্রমে এত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন যে তাঁদের সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের বড় কোনো ফারাক নেই।
‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ কথাটা তখন থেকেই শোনা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রসঙ্গেই কথাটা ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ‘ইম্পেরিয়াল’ প্রেসিডেন্সি সত্যি সত্যি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দেবে, এ কথা সম্ভবত কেউ ভাবেনি।
সেই ভয়ের কথাই বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমস–এর ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথান সোয়ান। তাঁদের নতুন বই রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সর্বময় ক্ষমতাধর এক রাজা। তিনি নিজে তা–ই মনে করেন, পৃথিবীও এখন তাঁকে সেভাবেই দেখছে।
আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সামনে যে প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন সর্বক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট, না দেশের শাসনতন্ত্র—কে এই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?
‘পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল নগরী’
প্রেসিডেন্ট রিগ্যান বলেছিলেন, আমেরিকা হচ্ছে পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল এক নগরী। ১৯৮৯ সালে তাঁর বিদায়ী ভাষণে তিনি এই আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ধনজনে ও শৌর্যে সবার সেরা এই দেশ পৃথিবীর মুক্তিপ্রত্যাশী সব মানুষের জন্য একটি ‘খোলা গৃহ’।
আমেরিকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ, এ কথায় কোনো সন্দেহ নেই। তার গণতান্ত্রিক ভিত্তিও সবচেয়ে পুরোনো। মুক্তি ও প্রাচুর্যের আশায় পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিজের দেশে কথা বলার অধিকার হারিয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ।
কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল নগরীর সব বাসিন্দা সমান অধিকার ভোগ করে না। ১৭৭৬ সালে নয় যেমন, তেমনি এখনো নয়।
ইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে সাড়ম্বরে যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ জারি করা হয়, তাতে বলা হয়েছিল ঈশ্বরের সৃষ্ট সব মানুষই সমান। অথচ বেন ফ্রাঙ্কলিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের দেনদরবারের পর যে শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়, তাতে দেশের লাখ লাখ কৃষ্ণকায় মানুষকে বড়জোর তিন-পঞ্চমাংশ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
১৮৬৫ সালে শাসনতন্ত্রের ১৩তম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও কালো ও বাদামি মানুষেরা দেড় শ বছর পরেও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক নয়।
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কালো মানুষেরা এ দেশের সবচেয়ে অনগ্রসর ও দরিদ্র। প্রতি চারজন কালো শিশুর একজন অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার। প্রতি চারজন কৃষ্ণকায় পুরুষের একজন তাদের জীবদ্দশায় একবারের জন্য হলেও জেলে গেছে।